মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। ইরানকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই সম্ভাব্য হামলায় লজিস্টিক ও গোয়েন্দা সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং ব্রিটেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাতে এই খবর প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী গণমাধ্যম 'Middle East Eye'।
ট্রাম্প প্রশাসনের ‘মহা-পরিকল্পনা’ ও আঞ্চলিক মিত্র
রোববার (২৫ জানুয়ারি) ইসরায়েলের জনপ্রিয় দৈনিক 'Israel Hayom' এক প্রতিবেদনে জানায়, নবনির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ইরানের ওপর একটি শক্তিশালী এবং চূড়ান্ত আক্রমণ চালানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এই আক্রমণকে তারা কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব খর্ব করার একটি ‘Strategic Step’ বা কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনাকে জোরালো সমর্থন দিচ্ছে আবু ধাবি এবং জর্ডান। এমনকি ইউরোপীয় শক্তি হিসেবে যুক্তরাজ্যও এই জোটে শামিল হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও ‘এয়ার ডিফেন্স’ সুরক্ষা
সূত্রমতে, এই সামরিক অভিযানে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ব্রিটেন এবং জর্ডান সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে না নামলেও 'Intelligence' এবং 'Operational Data' শেয়ার করার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার ক্ষেত্রে এই দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।
এই সমন্বিত অভিযানের মূল লক্ষ্য হবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের কেন্দ্রবিন্দু ‘Energy Infrastructure’ বা সাগরের শক্তি অবকাঠামোকে ইরানের পাল্টা হামলা থেকে রক্ষা করা।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দৌড়ঝাঁপ
সামরিক এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের 'Central Command' (CENTCOM)-এর প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার গত শনিবার ইসরায়েল সফর করেছেন। সেখানে তিনি ইসরায়েলের শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। ইসরায়েলি একটি নিরাপত্তা সূত্র দাবি করেছে, দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে রয়েছে। তারা সম্মিলিতভাবে 'Logistics Support' এবং 'Air Defense System' ব্যবহারের রূপরেখা চূড়ান্ত করছেন।
আরব বিশ্বের দ্বিধাবিভক্তি ও ‘ক্রসফায়ার’ আতঙ্ক
ইরান ইস্যুতে আরব দেশগুলোর মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন দেখা যাচ্ছে। যখন জর্ডান ও ইউএই ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র বলয়ের দিকে ঝুঁকছে, তখন সৌদি আরব, ওমান এবং কাতার এই উত্তেজনা প্রশমনে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকজন কূটনৈতিক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার প্রতিক্রিয়ায় তারা ‘Crossfire’ বা দ্বিমুখী আক্রমণের শিকারে পরিণত হতে পারেন। সৌদি আরব ও কাতার ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনকে নতুন কোনো হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রহস্যজনক অবস্থান এই সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে।
যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণ নিয়ে এখনো কিছু সংশয় থাকলেও ট্রাম্পের ‘মিত্রদের আরও সক্রিয় হওয়ার’ নীতির কারণে লন্ডন শেষ পর্যন্ত এই অভিযানে নামমাত্র হলেও যুক্ত থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে, যেখানে সামান্য একটি উস্কানি পুরো অঞ্চলকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতে পারে।