বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারকে (এসপি) তাদের দাপ্তরিক হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলা শাখার সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামকে কেন্দ্র করে রোববার (২৫ জানুয়ারি) একাধিক বিদেশি নম্বর থেকে এই হুমকি প্রদান করা হয়। প্রশাসনের শীর্ষ দুই কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে এ ধরনের সাইবার আক্রমণের ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ভাইরাল অডিওতে কুরুচিপূর্ণ হুমকির চিত্র
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (Social Media) ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও ক্লিপে দেখা যায়, বাগেরহাটের পুলিশ সুপারের ব্যক্তিগত দাপ্তরিক হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করে অত্যন্ত আপত্তিকর ও অকথ্য ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। ওই অডিওতে শোনা যায়, ফোন রিসিভ করার পরপরই অপর প্রান্ত থেকে জনৈক ব্যক্তি চরম আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বলতে থাকেন, ‘এই... কী করছস, সাদ্দামের লগে কী করছস?’
হুমকিদাতা পুলিশ সুপারকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে সাদ্দামকে গ্রেফতারের বিষয়টি উল্লেখ করে অত্যন্ত ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক ভাষায় বলা হয়, ‘তুই অ্যারেস্ট করাই দিছস... তোর পোলা-মাইয়াও যেন তোরে না দ্যাহে...’। মূলত প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে ভয়ভীতি সঞ্চার করতেই এমন ‘বিদ্বেষমূলক বক্তব্য’ (Hate Speech) দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য ও আইনি পদক্ষেপ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ওই অডিও কথোপকথনটি সত্য। বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে জানান, তিনি বেশ কয়েকটি বিদেশি নম্বর থেকে এ ধরনের হুমকিমূলক ফোন কল পেয়েছেন। তিনি বলেন, “বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। কারা এই ঘটনার নেপথ্যে কাজ করছে এবং কোন দেশ থেকে এই কলগুলো করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সাইবার ক্রাইম ইউনিট এ নিয়ে কাজ করছে এবং দ্রুতই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জেলা প্রশাসকের নির্ভীক অবস্থান ও ‘বট নম্বর’ সন্দেহ
একইভাবে হুমকির শিকার হয়েছেন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন। তবে এ ঘটনায় তিনি মোটেও বিচলিত নন বলে জানিয়েছেন। জেলা প্রশাসক বলেন, “জনসেবায় প্রশাসন সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে ছিল এবং আছে। কোনো মহলের হুমকিতে সরকারি কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হবে না। আমাদের ধারণা, সম্ভবত কিছু ‘বট নম্বর’ (Bot Number) বা ‘ভিওআইপি’ (VoIP) প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচয় গোপন রেখে এই কলগুলো করা হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হচ্ছে।
প্রেক্ষাপট: নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের তৎপরতা
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সম্প্রতি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার। এর পর থেকেই সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়। বাগেরহাটে সাদ্দাম হোসেনের গ্রেফতার বা আইনি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করেই তার সমর্থকরা বিদেশ থেকে বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই ‘ডিজিটাল হ্যারাসমেন্ট’ (Digital Harassment) শুরু করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর এই ধরনের সংঘবদ্ধ হুমকি দেওয়ার ঘটনাকে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার একটি অপচেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনাই এখন প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ।