• মতামত
  • শক্তির অপপ্রয়োগে ক্ষয় হচ্ছে মার্কিন নেতৃত্ব: 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতিই কি যুক্তরাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্নতার পথে ঠেলছে?

শক্তির অপপ্রয়োগে ক্ষয় হচ্ছে মার্কিন নেতৃত্ব: 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতিই কি যুক্তরাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্নতার পথে ঠেলছে?

মতামত ১ মিনিট পড়া
শক্তির অপপ্রয়োগে ক্ষয় হচ্ছে মার্কিন নেতৃত্ব: 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতিই কি যুক্তরাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্নতার পথে ঠেলছে?

বুশের ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’-এর ভুল থেকে শিক্ষা নেননি ট্রাম্প; কূটনীতি-র বদলে ভীতিপ্রদর্শন-কে কৌশল করায় কম নিরাপদ ও কম সম্মানিত যুক্তরাষ্ট্র।

২০০৩ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ যুদ্ধজাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইরাকে বড় ধরনের যুদ্ধপর্ব শেষ হয়েছে—তখন তাঁর মাথার ওপরে ঝুলছিল বিশাল ব্যানার, যেখানে লেখা: ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’ (Mission Accomplished)। বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। অতিরিক্ত শক্তিপ্রদর্শন সাময়িক যুদ্ধ বন্ধ করলেও, তা ইরাকের নিরাপত্তা বা দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের বৈধতা (Legitimacy) নিশ্চিত করতে পারেনি। বুশের ওই নাটকীয় ভাষণের পর শুরু হয় বিদ্রোহ ও আঞ্চলিক অস্থিরতা—যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল এক বড় শিক্ষা।

ট্রাম্পের ‘আয়রনম্যান’ কৌশল ও আমেরিকান ঐতিহ্যের ওপর চাপ

সেই শিক্ষা বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। নিজেকে ‘আয়রনম্যান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করছেন। বিভিন্ন দেশ ও ব্যক্তিকে ভয় দেখাচ্ছেন, ব্যবহার করছেন আক্রমণাত্মক ভাষা। অন্যায়্য শুল্ক (Unfair Tariff) আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যান্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করছেন। এর ফলে বিশ্বে আমেরিকার অবস্থান ক্রমে ক্ষয় হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শক্তি যখন রুক্ষ বা অসংগতভাবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা প্রতিপক্ষকে বশ মানায় না; বরং মিত্রদের দূরে ঠেলে দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বীদের শেখায় কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটাতে হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-এর পর থেকে যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা (World Order) টিকে আছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নামে প্রচারিত নীতি তা থেকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। পরিহাস হলো, এই নীতি শেষ পর্যন্ত আমেরিকার গুরুত্বই কমিয়ে দিতে পারে।

জোটের ভারসাম্য ভাঙা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন

বহু দশক ধরে বিশ্বনেতৃত্বের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল প্রশ্নাতীত। শুধু শক্ত আঘাত হানতে পারার ক্ষমতার কারণে নয়, বরং নানা দেশকে নিজের জোটে এনে যুক্তরাষ্ট্র শত্রুদের নিবৃত্ত করেছে। জোটভুক্ত (Allied) দেশগুলোর অভিন্ন স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ভারসাম্য রক্ষা করে চলছিল। কিন্তু শক্তি আর ভীতিপ্রদর্শন-কে কৌশলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে ট্রাম্প এই ভারসাম্য ভেঙে দিচ্ছেন।

ট্রাম্পের ভাষা প্রায়ই উত্তেজনা বাড়ালেও, ইতিহাস বলে, বিশ্বাসযোগ্যতা (Credibility) শব্দের উচ্চতায় মাপা যায় না। কিউবান ক্ষেপণাস্ত্রসংকট সমস্যার সমাধান হয়েছিল গোপন কূটনীতি ও পারস্পরিক ছাড়ের মাধ্যমে, হুমকির মাধ্যমে নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ও ন্যাটো (NATO)-র মতো প্রতিষ্ঠান গঠনে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দিয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে যেমন আমেরিকার প্রভাব নিশ্চিত করে, অন্যদিকে মিত্রদের আশ্বস্ত করে ও প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও স্থিতিশীল রাখে। ট্রাম্পের নীতিগুলো এই কাঠামোর ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করছে।

নৈতিক কর্তৃত্বের ক্ষয় এবং শক্তির অপব্যবহার

জাতীয় নিরাপত্তা কেবল ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এটি টিকে থাকে বিশ্বাস, বিশ্বাসযোগ্যতা ও সংযত শক্তি ব্যবহারের ওপর। এই মানদণ্ডে ট্রাম্পের কঠোরতার রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্রকে আগের চেয়ে কম নিরাপদ—এবং কম সম্মানিত—করে তুলেছে।

ট্রাম্প যখন শক্তিশালী স্বৈরশাসকদের প্রশংসা করেন, মানবাধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগ উড়িয়ে দেন বা আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটিয়ে যান, তখন তিনি মার্কিন নেতৃত্বের আকর্ষণই কমিয়ে দেন। ইতিহাস বলে, পরাশক্তিগুলো দুর্বল হয় শক্তি হারিয়ে নয়, বরং শক্তির অপব্যবহার করে। ট্রাম্প ভীতিপ্রদর্শনকে কূটনীতি-র বিকল্প বানানোয় আমেরিকার নৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

ক্ষমতার শূন্যতা ও আন্তর্জাতিক বিকল্পের উত্থান

বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই ধরা যাক। ট্রাম্পের শুল্ক ও বাণিজ্যযুদ্ধ (Trade War) অন্য দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য করছে। এই কারণে পশ্চিমা ঐক্যে ফাটল দেখা দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নিয়ে ভাবছে। এশীয় দেশগুলো ওয়াশিংটনকে পাশ কাটিয়ে আঞ্চলিক বাণিজ্য জোরদার করছে।

ক্ষমতার শূন্যতা টিকে থাকে না। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব থেকে সরে আসায় চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ (Belt and Road Initiative)-এর মতো বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি মানে কে কত জোরে হুমকি দেয় তা নয়, বরং কতজন বিশ্বাস করে যে তার পাশে দাঁড়ানো সার্থক। শেষ পর্যন্ত জাতীয় নিরাপত্তা কেবল ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এটি টিকে থাকে বিশ্বাস, বিশ্বাসযোগ্যতা ও সংযত শক্তি ব্যবহারের ওপর। এই মানদণ্ডে ট্রাম্পের কঠোরতার রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্রকে আগের চেয়ে কম নিরাপদ—এবং কম সম্মানিত—করে তুলেছে।

Tags: donald trump trade war nato us foreign policy geopolitical shift mission accomplished global leadership moral authority