দেশের বাজারে মূল্যবান ধাতু স্বর্ণের দাম আবারও এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছেছে। অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে এবার ভরিতে ৭ হাজার ৩৪৮ টাকা বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন এই মূল্য অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৮ টাকা। দেশের ইতিহাসে স্বর্ণের এই আকাশচুম্বী দাম এর আগে কখনো দেখা যায়নি।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই ঐতিহাসিক মূল্যবৃদ্ধির তথ্য জানানো হয়। সংগঠনটি জানিয়েছে, বুধবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিট থেকেই নতুন এই দাম কার্যকর হয়েছে।
রেকর্ড মূল্যের নেপথ্য কারণ
বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (Pure Gold) সরবরাহ ও মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই সমন্বয় করা হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদার প্রেক্ষাপটে স্বর্ণের Market Value প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে এই নতুন মূল্য তালিকায়।
ক্যারেটভেদে স্বর্ণের নতুন দরের বিস্তারিত
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের বাজারে এখন থেকে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণ কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হবে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৮ টাকা। এছাড়া অন্যান্য মানের স্বর্ণের দামও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে:
২১ ক্যারেট প্রতি ভরি: ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪৮৩ টাকা।
১৮ ক্যারেট প্রতি ভরি: ২ লাখ ২০ হাজার ৭৪১ টাকা।
সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ প্রতি ভরি: ১ লাখ ৮১ হাজার ৭২৫ টাকা।
ভ্যাট ও মজুরির নতুন সমীকরণ বাজুস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, নির্ধারিত এই বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে সরকারকে আবশ্যিকভাবে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট (Value Added Tax) প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি গহনা তৈরির জন্য বাজুস-নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি ৬ শতাংশ যুক্ত করা বাধ্যতামূলক। তবে গহনার ডিজাইন এবং মানের ওপর ভিত্তি করে এই মজুরির তারতম্য হতে পারে। ফলে একজন সাধারণ ক্রেতাকে এক ভরি গহনা কিনতে হলে প্রায় ৩ লাখ টাকার কাছাকাছি খরচ করতে হবে।
অপ্রতিরোধ্য ঊর্ধ্বমুখী বাজার ও গত বছরের পরিসংখ্যান
চলতি ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ১৫ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। এর আগে গত ২৬ জানুয়ারি স্বর্ণের দাম বাড়িয়ে ২ লাখ ৬২ হাজার ৪৪০ টাকা করা হয়েছিল, যা মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে পুরনো রেকর্ডে পরিণত হলো।
উল্লেখ্য, বিগত ২০২৫ সালটি স্বর্ণের বাজারের জন্য ছিল চরম অস্থির। ওই বছর মোট ৯৩ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৬৪ বারই ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ক্রমাগত এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
রুপার বাজার স্থিতিশীল থাকলেও রয়েছে সর্বোচ্চ দামে
স্বর্ণের দাম রেকর্ড পরিমাণে বাড়লেও রুপার দাম অপরিবর্তিত রেখেছে বাজুস। বর্তমানে বাজারে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৭ হাজার ৭৫৭ টাকায়, যা রুপার ক্ষেত্রেও দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দর। এছাড়া ২১ ক্যারেট ৭ হাজার ৪০৭ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৬ হাজার ৩৫৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা ৪ হাজার ৭৮২ টাকায় বেচকেনা হচ্ছে। রুপার ক্ষেত্রেও এ বছর এখন পর্যন্ত ১১ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের অস্থিরতা এবং দেশীয় মুদ্রার বিনিময় হারের প্রভাবে দেশের বাজারে এই উচ্চমূল্য বজায় থাকছে। এই পরিস্থিতি দেশের জুয়েলারি শিল্পে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।