মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) ফের যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে ইরানকে চূড়ান্ত আল্টিমেটাম দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সময় ফুরিয়ে আসছে উল্লেখ করে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমঝোতায় না এলে ইরানে এযাবৎকালের সবচেয়ে ‘ভয়াবহ’ হামলা চালানো হবে। তবে ট্রাম্পের এই রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের সাফ কথা, কোনো জবরদস্তির মুখে তারা মাথা নত করবে না এবং যেকোনো যুদ্ধের জন্য তাদের সামরিক বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত।
রণসজ্জা ও ট্রাম্পের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ (Truth Social)-এ এক বিস্ফোরক পোস্টের মাধ্যমে এই হুমকি দেন। ট্রাম্প জানান, একটি বিশাল মার্কিন নৌবহর (Naval Fleet) অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা যেকোনো মিশন সম্পন্ন করতে সক্ষম।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি (Nuclear Program) নিয়ে ট্রাম্পের বার্তা অত্যন্ত কড়া। তিনি বলেন, “একটি টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ইরান যদি আলোচনায় বসে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে সমঝোতা না করে, তবে দেশটিতে পরবর্তী হামলার মাত্রা হবে অকল্পনীয় এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় মাপের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকটের দাবি ওয়াশিংটনের
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির সমান্তরালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও (Marco Rubio) ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা নিয়ে তীব্র আক্রমণ চালিয়েছেন। তাঁর দাবি, বর্তমান ইরান সরকার ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল সময় পার করছে এবং দেশটির অর্থনীতি (Economy) সম্পূর্ণ ধসে পড়ার দ্বারপ্রান্তে। রুবিও আরও মন্তব্য করেন, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা বা সর্বোচ্চ নেতার পতন ঘটলে পরবর্তী ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হবে, যা তেহরানের জন্য অস্তিত্বের সংকট।
তেহরানের পাল্টা হুঙ্কার: ‘যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত’
ওয়াশিংটনের এই মারমুখী অবস্থানের বিপরীতে বিন্দুমাত্র নমনীয়তা দেখায়নি তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন, মার্কিন আগ্রাসনের মোকাবিলায় তাঁদের সশস্ত্র বাহিনী সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যেকোনো পথে মার্কিন হামলা হলে তার তাৎক্ষণিক এবং চরম পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।”
আরাঘচি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান কোনো ধরনের হুমকি বা জবরদস্তির মুখে আলোচনায় বসবে না। তবে তিনি কূটনীতির পথ একেবারে বন্ধ করে দেননি। তাঁর মতে, কোনো প্রকার চাপ সৃষ্টি না করে যদি একটি ‘ন্যায্য ও সমান’ (Fair and Equal) চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়, তবে তেহরান তা বিবেচনা করতে রাজি।
কূটনীতির জানালা কি এখনো খোলা?
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের মিশনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক কিন্তু সতর্ক মন্তব্য করেছে। তারা জানিয়েছে, আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া মানেই ইরানের দুর্বলতা নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে ইরানি মিশন বলেছে, যদি ইরানকে যুদ্ধের পথে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে তেহরান এমনভাবে আত্মরক্ষা ও পাল্টা আঘাত (Counter-attack) করবে, যা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও জলসীমায় যে রণপ্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে, তাতে বিশ্ববাজার ও জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের এই ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ (Maximum Pressure) পলিসি ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাবে নাকি এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা করবে, তা নিয়েই এখন বিশ্বজুড়ে চলছে টানটান উত্তেজনা।