জুলাই সনদ ও মৌলিক অধিকারের সম্পর্ক
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাসাবো ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার মিলনায়তনে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণে বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, “জুলাই সনদের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের মৌলিক অধিকার উপলব্ধি ও প্রতিষ্ঠা করা। এই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থান রচিত হয়েছে।” তাঁর মতে, দীর্ঘ ৫৪ বছরের রক্তক্ষয়ী পথ পাড়ি দিয়ে আবারও মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ এসেছে এবং এই সুযোগ হেলায় হারানো যাবে না।
সাম্য, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
অধ্যাপক আলী রীয়াজ জোর দিয়ে বলেন, জুলাই সনদ প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিত করবে। এটি এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে যা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক হবে। সেই সমাজে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির সঙ্গে অন্য ব্যক্তির পার্থক্য করবে না। তিনি আরও বলেন, এই সনদ নাগরিক হিসেবে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করবে।
ফ্যাসিবাদের পরিবর্তন ও গণভোটের আহ্বান
ফ্যাসিবাদের নিষ্পেষণে জর্জরিত রাষ্ট্রকে উদ্ধার করতে হলে প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে ব্যাপক সংস্কার করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন আলী রীয়াজ। তাঁর মতে, সেই সংস্কারের লক্ষ্যেই আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলা সময়ের দাবি। তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধানের ৭(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে সেই জনগণকেই বঞ্চিত রাখা হয়েছে। তাই বিবেকের তাড়নায় গণভোটে অংশগ্রহণ করে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে জয়লাভ করা আবশ্যক।
রাষ্ট্রপতি নিয়োগ ও ৭০ অনুচ্ছেদে সংস্কার প্রস্তাব
রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ও দায়িত্ব প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী জানান, বিগত সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছানুযায়ী সবকিছু হতো। যদিও সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য কোনো সিদ্ধান্ত এককভাবে নিতে পারেন না। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে হলেও, বাস্তবে এগুলো তৎকালীন সরকারপ্রধানের ইচ্ছা অনুসারেই হয়ে থাকে।
সংবিধানের ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদকে নিজ দলের এমপিদের মুখে স্কচটেপ এঁটে দেওয়ার মতো বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তাঁর মতে, এই ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক বিকাশে বিশাল বাধা। এই ব্যবস্থার উত্তরণের জন্য সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, অর্থবিল এবং আস্থা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে এমপিরা নিজ নিজ দলের অনুগত থাকবেন, তবে অন্য সব বিষয়ে তাঁরা স্বাধীন মতামত দিতে পারবেন।
অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল উদ্দেশ্য সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধকে সম্মানের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটা সমাজ চাই, যে সমাজে আমার সন্তানের পরিচয় নির্ধারণ হবে তার যোগ্যতার ওপর, তার অর্জিত জ্ঞান ও প্রচেষ্টার ওপর।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিলে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ থাকবে না বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস থাকবে না বলে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তা ঠিক নয় এবং এ ধরনের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
মতবিনিময় সভায় বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ভবেশ চাকমা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন, বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব জয়দত্ত বড়ুয়া এবং খ্রিষ্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি পিউস কস্তা প্রমুখ বক্তব্য দেন।