• মতামত
  • মুক্তিযুদ্ধের নীরব ট্রাজেডি: এই আলো কি সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়েটিই?

মুক্তিযুদ্ধের নীরব ট্রাজেডি: এই আলো কি সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়েটিই?

একাত্তরের যুদ্ধ, দমদম বিমানবন্দরের এক রহস্যময়ী তরুণী, আর বহু বছর ধরে বয়ে চলা এক মায়ের নীরব অপেক্ষা—'দ্য লাইট বিটুইন ওশেনস' সিনেমা দেখতে গিয়ে লেখকের জীবনে ফিরে আসা এক হারিয়ে যাওয়া শিশুর মর্মান্তিক স্মৃতিচারণ।

মতামত ১ মিনিট পড়া
মুক্তিযুদ্ধের নীরব ট্রাজেডি: এই আলো কি সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়েটিই?

যুদ্ধ কাগজে-কলমে শেষ হলেও মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব ও প্রিয়জন হারানোর বেদনা কখনো শেষ হয় না। ১৯৭১ সালের এক মর্মান্তিক দৃশ্যের স্মৃতি লেখককে তাড়িয়ে বেড়ায়, যেখানে জনসমুদ্রে হারিয়ে যায় এক শিশু 'আলো'। বহু বছর পর এক বিমানযাত্রায় এক তরুণীর সঙ্গে লেখকের সাক্ষাৎ সেই পুরনো স্মৃতিকে নতুন করে উসকে দেয়—এই আলো কি সেই হারিয়ে যাওয়া শিশুটিই?

যুদ্ধ শেষ হয় কাগজে-কলমে। কিন্তু মানুষের ভেতরে যুদ্ধ কখনো শেষ হয় না। বিশেষ করে যারা যুদ্ধে প্রিয়জনকে হারায়। ১৯৭১ সালে লেখক সেই নির্মমতা উপলব্ধি করেন—শুধু আগুন, ভাঙা ঘর আর আতঙ্কিত মানুষের ছুটে চলা। তিনি দেখেছিলেন এক মা তার মেয়েকে বুকে চেপে ধরে দৌড়াচ্ছেন, পর মুহূর্তেই জনতার ভিড়ে সেই বুক ফাঁকা হয়ে যায়। শিশুটি হারিয়ে যায়। কেউ জানত না সে কোথায় গেল, শুধু জানা ছিল, একটি 'আলো' নিভে গেল।

দমদম বিমানবন্দরে আকস্মিক সাক্ষাৎ

১৯৮৭ সাল। লেখক ঢাকা থেকে দীর্ঘ যাত্রাপথে দমদম বিমানবন্দরে পৌঁছান। প্লেনে তার সিট নম্বরের পাশে এসে বসল এক তরুণী, বয়স কুড়ির কাছাকাছি। তার মুখে লাজুক আত্মবিশ্বাস, চোখে দৃঢ়তা। সাধারণ আলাপচারিতার একপর্যায়ে জানা গেল, মেয়েটি সরকারি বৃত্তি নিয়ে বেলগ্রেড যাচ্ছে পড়াশোনা করতে। তার বাবা-মা বাংলাদেশি হলেও ‘রেভুলেশনের’ সময় দেশ ছেড়েছিলেন। তখন মেয়েটির বয়স ছিল মাত্র চার-পাঁচ মাস।

মেয়েটি তার দেশ ছাড়ার গল্প বলে তার বাবা-মায়ের শোনা কাহিনি হিসেবেই—যেন তা তার জীবনের শুরু হলেও, তার নিজের নয়। লেখকের মনে এক অদ্ভুত পরিচিতি খুঁজে পাওয়ার অনুভূতি জাগে। মনে হয়, বহু বছর আগে অন্য এক বাস্তবতায় তিনি এই মুখ দেখেছেন। অস্বস্তির কারণে লেখক আর বেশি প্রশ্ন করেননি, শুধু নীরবে শুনে গেছেন।

হারিয়ে যাওয়া আলোর স্মৃতি আর দীর্ঘ অপেক্ষা

অনেক বছর পর লেখকের মনে ১৯৭১ সালের স্মৃতি আবার ফিরে আসে, যখন এক কিশোরীর মুখের গড়ন, চোখের দৃষ্টি ও হাসির ভেতরের অনিশ্চয়তা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। মনে হয়, সময় কি এমন নির্মম খেলা খেলতে পারে?

দীর্ঘ জার্নি শেষে বেলগ্রেডে নামার পর বিদায়বেলায় মেয়েটি লেখকের সুইডেনের ঠিকানা চেয়ে নেয়। বহু বছর পর লেখক আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশটা পাল্টে গেলেও অপেক্ষার ক্লান্তি যেন মানুষগুলোর চোখে জমে ছিল। বহু বছর পর সেই হারিয়ে যাওয়া শিশুর মায়ের সঙ্গে তার দেখা হয়। বয়স তাকে ভেঙে দিলেও অপেক্ষা তাকে ছাড়েনি। মেয়ের খবর জানতে চাইলে মা শুধু 'না' বলেন, যে 'না' শব্দটির ভেতর ছিল জীবনের সব ক্লান্তি। আলো নামটি আর উচ্চারণ করার সাহস লেখকের হয়নি, কারণ কিছু নাম উচ্চারণ করলে শুধু মানুষ নয়, সময়ও কেঁপে ওঠে। তিনি সেদিন বুঝতে পারেন, যুদ্ধ শুধু মানুষ কেড়ে নেয় না, অপেক্ষাকেও দীর্ঘ করে দেয়।

আলোর খোঁজ এবং নীরব থাকার সিদ্ধান্ত

সুইডেনে ফিরে এসে লেখক আলোকে খুঁজে পান। নতুন করে কথা হয়, সন্দেহ বাড়ে—কিন্তু নিশ্চিত হওয়া যায় না, এই আলোই কি সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়েটি। একদিন লেখক তার বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুমতি চাইলে আলো টেলিফোন নম্বর দেয়। লেখক ফোন করে নিজের পরিচয় ও ১৯৭১ সালের কিছু স্মৃতি বলেন। ওপাশ থেকে আলো জিজ্ঞেস করে, কীভাবে তিনি তাদের পরিচয় জানলেন। লেখক সব বলার পরই লাইন কেটে যায়।

এরপর আলো আর যোগাযোগ করেনি। লেখক পরে জানতে পারেন, সে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় বিয়ে করে নতুন স্থির জীবন শুরু করেছে। তখন লেখক নিজের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেন যে মেয়েটি ভালো আছে, তাকে বিরক্ত করা উচিত না। আর যে মা এত বছর আলোকে ছাড়া বেঁচে ছিলেন, তাকেও পুরনো কাহিনি মনে করিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। আলোর মা কয়েক বছর আগে মারা যান। লেখক মনে করেন, কিছু প্রশ্ন উত্তরহীন থাকাই মানবিক।

‘The Light Between Oceans’ উপন্যাসের প্রতিচ্ছবি

হঠাৎ এই স্মৃতিচারণের কারণ হলো—সিনেমার পর্দায় ‘The Light Between Oceans’ ছবিটি দেখা। অস্ট্রেলীয় লেখিকা এম. এল. স্টেডম্যানের এই উপন্যাসের মূল বিষয় মানুষের নৈতিক দ্বন্দ্ব, নীরবতা, ভালোবাসা এবং দায়িত্বের প্রশ্ন। যুদ্ধ এখানে কেবল একটি পটভূমি। উপন্যাসের বাতিঘরের আলো লেখকের কাছে শুধু পথের প্রতীক নয়, বরং চাপা পড়ে থাকা স্মৃতিকেও দৃশ্যমান করে তোলে।

উপন্যাসে যুদ্ধকালীন সময়ে এক দম্পতির জীবনে একটি শিশুর আগমন হয় অপ্রত্যাশিতভাবে। তারা সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে এবং ভাবে, সময় হয়তো সব ঠিক করে দেবে। কিন্তু সময় কেবল সাক্ষী হয়ে থাকে। এই উপলব্ধিই লেখককে ১৯৭১ সালের ঘটনায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। উপন্যাসের শেষ অংশে নৈতিক দায়বদ্ধতার যে প্রশ্নটি ওঠে—কে নীরব ছিল, কে দেরি করেছিল—তা লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের সেই ১৯৮৭ সালের সাক্ষাৎ আর আলোর মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার স্মৃতিকে বাতিঘরের আলোর মতো স্পষ্ট করে তোলে।

দায়িত্ব ও নীরবতার ট্রাজেডি

লেখক মনে করেন, এই গল্প তুলে ধরা জরুরি উত্তর দেওয়ার জন্য নয়, বরং একটি সত্য রেখে যাওয়ার জন্য। যুদ্ধ শুধু মানুষ হত্যা করে না, কিছু শিশুকে সে ইতিহাসের বাইরে রেখে দেয় এবং কিছু মানুষকে আজীবনের নীরবতা দিয়ে যায়। ‘The Light Between Oceans’ যেমন মনে করিয়ে দেয়—অপরাধবোধ ভাগ করা গেলেও, দায় শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগতই থেকে যায়। লেখকের বারংবার মনে হয়, 'এই আলো কি সেই মেয়েটিই?'—যে প্রশ্নের উত্তর হয়তো তিনি জানেন, কিন্তু কিছু সত্য বলা হয় না। চুপ করে থাকা কখনো কখনো অপরাধ নয়, বরং দায়িত্ব।

Tags: bangladesh liberation war 1971 lost child refugee war tragedy stockholm belgrade the light between oceans opinion