ভঙ্গুর দশা কাটিয়ে পুনর্জাগরণের পথে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং খাত। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, সেচ্ছাচারিতা আর ঋণের নামে অর্থ লোপাটের ক্ষত কাটিয়ে নতুন উদ্যোমে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে সরকারি চার ব্যাংক— সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী। ২০২৫ সালের বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গত এক বছরে এই চার প্রতিষ্ঠানে আমানত বা ‘Deposit’ বেড়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। একইসঙ্গে রেমিট্যান্স আহরণ এবং খেলাপি ঋণ আদায়েও এসেছে অভাবনীয় সাফল্য।
আস্থার সংকটে সুশাসনের প্রলেপ
বিগত আওয়ামী সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ অনিয়মের কঙ্কাল বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিল। বিপুল পরিমাণ ‘Non-Performing Loan (NPL)’ বা খেলাপি ঋণের বোঝায় ব্যাংকগুলোর মেরুদণ্ড যখন প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম, তখনই অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নতুন পর্ষদ দায়িত্ব গ্রহণ করে। ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ‘Digital Governance’ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করায় সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে হারানো আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোতে নগদ অর্থের প্রবাহ বা ‘Cash Flow’ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিসংখ্যানের আয়নায় বড় সাফল্য
২০২৫ সালের প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই এক বছরে ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে ৫০ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। প্রবাসী আয় বা ‘Remittance’ এসেছে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় ‘Cushion’ হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া মন্দ ঋণ থেকে ‘Cash Recovery’ বা নগদ অর্থ আদায় হয়েছে ৪ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা।
ব্যাংকভিত্তিক চিত্র:
সোনালী ব্যাংক: রাষ্ট্রায়ত্ত এই বৃহৎ ব্যাংকে আমানত বেড়েছে ১৪ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ ১৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২ হাজার কোটি টাকা কম। ব্যাংকটি ৭৫০ কোটি টাকার ঋণ ‘Rescheduling’ বা পুনতফসিল করেছে।
অগ্রণী ব্যাংক: রেমিট্যান্স আহরণে চমক দেখিয়েছে এই ব্যাংকটি। চার ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৩ হাজার ৯৬১ কোটি টাকা রেমিট্যান্স এসেছে এখানে। আমানত বেড়েছে ১৩ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং শ্রেণিকৃত ঋণ বা ‘Classified Loan’ ২ শতাংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জনতা ব্যাংক: ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ আমানত সংগ্রহকারী হিসেবে নাম লিখিয়েছে জনতা ব্যাংক। প্রায় ১৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেছে তারা। পাশাপাশি ২৭ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকারও বেশি প্রবাসী আয় আহরণ করেছে ব্যাংকটি।
রূপালী ব্যাংক: এই ব্যাংকে আমানত বেড়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা। মোট ঋণের তুলনায় খেলাপি ঋণের হার ৬ শতাংশ কমিয়ে ৩৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ সোনালী ব্যাংকের এমডি ও সিইও মো. শওকত আলী এই অগ্রগতি নিয়ে দারুণ আশাবাদী। তিনি জানান, খেলাপি ঋণ আদায়ের গতি যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী মার্চের মধ্যে ‘Bad Loans’-এর পরিমাণ একটি স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নেমে আসবে।
তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া টিকিয়ে রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্সুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহীদুল জাহীদ বলেন, "সরকারি ব্যাংকগুলোকে সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে প্রভাবশালী বা ‘Heavyweight’ খেলাপিদের মাধ্যমে বেহাত হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ পুনরুদ্ধার করতে হলে কেবল ব্যাংকিং মেকানিজম যথেষ্ট নয়, বরং একটি শক্ত ‘Political Will’ বা রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।"
দেশের যেকোনো অর্থনৈতিক সংকটে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো ঢাল হিসেবে কাজ করে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকগুলোর এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের ‘Banking Industry’-তে নতুন গতির সঞ্চার হবে, যা সামগ্রিক ‘GDP Growth’ এবং ‘Job Creation’-এ সহায়ক ভূমিকা রাখবে।