মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও রণদামামা। ইরানের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতা রুখতে এবার সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের দাবি তুলেছে ইসরাইল। তেল আবিবের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই মুহূর্তে যদি তেহরানের ওপর বড় ধরনের কোনো সামরিক অভিঘাত (Military Strike) না চালানো হয়, তবে ইরান পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে থাকবে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সব নজর এখন হোয়াইট হাউসের দিকে—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কি ইসরাইলের এই বিপজ্জনক পথে পা বাড়াবেন?
গোপন বৈঠক ও ওয়াশিংটনে বিশেষ মিশন
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম কেএএন (KAN) জানিয়েছে, রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর বাসভবনে এক উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা বৈঠক ডাকেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ-এর প্রধান ডেভিড বার্নিয়া এবং ইসরাইলি সেনাপ্রধান (IDF Chief) ইয়াল জামির। এই বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল—ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি বিমান হামলা নিশ্চিত করা।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেই সেনাপ্রধান ইয়াল জামির অত্যন্ত গোপনে ওয়াশিংটন সফর করে এসেছেন। নজরদারি এড়াতে তিনি সামরিক বিমানের বদলে ব্যক্তিগত বিমানে পেন্টাগনে (Pentagon) পৌঁছান। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের সঙ্গে বৈঠক করেন। সূত্রের খবর, জামির মার্কিন কর্মকর্তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানকে থামানো সম্ভব নয়; বরং ‘Surgical Strike’ এখন সময়ের দাবি।
‘দুই সপ্তাহ থেকে দুই মাস’: এক অনিশ্চিত সময়সীমা
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর একটি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন সভায় ইয়াল জামির জানিয়েছেন, আগামী দুই সপ্তাহ থেকে দুই মাসের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আমূল বদলে যেতে পারে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ব্যবস্থা নেয়, তবে তা এই সময়ের মধ্যেই হতে হবে। তিনি এই পর্যায়কে একটি ‘অনিশ্চয়তার সময়’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে ইসরাইলি আর্মি রেডিওর ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে হামলার সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সম্ভাব্য টার্গেট নির্ধারণের কাজ চলছে জোরকদমে।
ট্রাম্পের কৌশল: সমঝোতা নাকি যুদ্ধ?
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে ‘Maximum Pressure’ নীতি গ্রহণ করেছেন। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবহর ও বিমান শক্তি জোরদার করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ট্রাম্পের এই রণসজ্জা আসলে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনার একটি কৌশল বা ‘Bargaining Chip’।
ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের বড় ভয় এখানেই। তেল আবিব আশঙ্কা করছে, ট্রাম্প হয়তো ইরানের সঙ্গে এমন কোনো নতুন পরমাণু চুক্তিতে (Nuclear Deal) পৌঁছাতে পারেন, যেখানে কেবল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আলোচনা হবে, কিন্তু ইরানের বিপজ্জনক ‘Ballistic Missile’ কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি বাদ পড়ে যেতে পারে। ইসরাইল চায় ইরানের পারমাণবিক পরিকাঠামো পুরোপুরি সমূলে বিনাশ (Dismantle) করতে।
ইরানের হুঁশিয়ারি ও আঞ্চলিক ঝুঁকি
অন্যদিকে, তেহরান হাত গুটিয়ে বসে নেই। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল যদি কোনো ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। তেহরানের হুঁশিয়ারি—যেকোনো মার্কিন হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে (Regional War) ঠেলে দেবে, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও পড়বে।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, সম্ভাব্য সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্স (IDF) সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প কি নেতানিয়াহুর ‘সামরিক সমাধানের’ পথে হাঁটবেন, নাকি কূটনীতির নতুন কোনো চাল চালবেন।