দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড চট্টগ্রাম বন্দরে গত চার দিন ধরে চলা অস্থিরতা এখন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (NCT) পরিচালনার দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক গ্লোবাল অপারেটর ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ (DP World)-কে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়েছে ২৪ ঘণ্টার সর্বাত্মক কর্মবিরতি। ‘বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর ডাকে এই কঠোর কর্মসূচির ফলে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।
জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ, স্থবির জেটি
টানা তিন দিন আংশিক কর্মবিরতি পালনের পর মঙ্গলবার সকাল থেকে আন্দোলন আরও কঠোর করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। বার্থ অপারেটরদের সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৮টার পরপরই বন্দরের সবচেয়ে পুরোনো জেনারেল কার্গো বার্থ (GCB) টার্মিনালের বিভিন্ন জেটিতে জাহাজ থেকে পণ্য ও কনটেইনার ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমে চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (CCT) ও এনসিটি (NCT) টার্মিনালে কাজ কিছুটা চললেও সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ শুরু করলে সেখানেও কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জেটিতে অবস্থানরত জাহাজগুলো এখন অলস বসে আছে।
ব্যাহত হচ্ছে কনটেইনার পরিবহন ও আইসিডি অপারেশন
কর্মবিরতির প্রভাব কেবল বন্দরের জেটিতেই সীমাবদ্ধ নেই; এর ফলে বন্দর ও দেশের ১৯টি বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (ICD) মধ্যে আমদানি, রপ্তানি ও খালি কনটেইনার পরিবহন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কনটেইনার চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘কম্পিউটারাইজড টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম’ (TOS) পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মচারীরা কাজ বন্ধ রাখায় এই ‘লজিস্টিক’ (Logistics) বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে সাপ্লাই চেইন (Supply Chain) ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নেতৃবৃন্দের হুঁশিয়ারি ও দাবি
সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের নেতা মো. হুমায়ুন কবির সংবাদমাধ্যমকে জানান, বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তিনি বলেন, “সকাল থেকে বন্দরের ভেতরে কোনো ধরনের কাজ হচ্ছে না। কোনো জাহাজ আসছে না বা বন্দর ছেড়ে যাচ্ছে না। আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে জাতীয় স্বার্থের অবমাননা।”
ইজারা বিতর্ক ও বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে সিসিটি (CCT) ও এনসিটি (NCT) টার্মিনাল দুটি পরিচালনা করছে চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড (CDDL)। তবে সরকারের পক্ষ থেকে টার্মিনাল দুটি পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তি করার প্রক্রিয়া শুরু হলে শ্রমিকদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীদের দাবি, স্থানীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ইজারা দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনৈতিক প্রভাবের শঙ্কা
বন্দর কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত এই কর্মবিরতি চললে বন্দরে কনটেইনার জট তীব্র হতে পারে। বন্দরের বহির্নোঙরে (Outer Anchorage) জাহাজের জট বাড়লে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর। এছাড়া পণ্য পরিবহনে বিলম্বের ফলে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ‘ডিউরেজ’ (Demurrage) চার্জ বা বিলম্ব মাশুল গুনতে হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে বাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করবে।
সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো এই সংকট নিরসনে কোনো সুনির্দিষ্ট আলোচনার ঘোষণা আসেনি। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে দ্রুত কোনো সমাধান না এলে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।