• জাতীয়
  • রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাফল্যের নতুন দিগন্ত: জ্বালানি লোডিংয়ের চূড়ান্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাফল্যের নতুন দিগন্ত: জ্বালানি লোডিংয়ের চূড়ান্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাফল্যের নতুন দিগন্ত: জ্বালানি লোডিংয়ের চূড়ান্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন

পারমাণবিক জ্বালানি বা ‘নিউক্লিয়ার ফুয়েল’ হস্তান্তরের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ; ‘কমপ্রিহেনসিভ সেফটি সিস্টেম টেস্ট’-এ উত্তীর্ণ প্রকল্পের প্রথম ইউনিট।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও মেগা প্রকল্পের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (RNPP)। প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি বা ‘Nuclear Fuel’ লোডিংয়ের ঠিক আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ধাপ ‘কমপ্রিহেনসিভ সেফটি সিস্টেম টেস্ট’ (Comprehensive Safety System Test) সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান এই সাফল্যের খবরটি নিশ্চিত করেছেন।

নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষায় প্রথম ইউনিট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং প্রক্রিয়ায় এই পরীক্ষাটিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও অপরিহার্য ধরা হয়। ড. জাহেদুল হাসান জানান, এই পরীক্ষার মাধ্যমে রিয়্যাক্টর বিল্ডিংয়ের ‘Containment Integrity’, অভ্যন্তরীণ বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ফুয়েল পুল সেফটি এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় সেফটি সিস্টেমগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে। নকশা অনুযায়ী এই সিস্টেমগুলো স্বাভাবিক ও ‘Extended Condition’-এ কতটা নির্ভুলভাবে কাজ করতে সক্ষম, তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো।

স্প্রিংকলার সিস্টেম ও কৃত্রিম প্লাবন পর্যবেক্ষণ পরীক্ষাগারে রিয়্যাক্টর হলের শীর্ষে স্থাপিত ‘Sprinkler System’ টানা ১২ ঘণ্টা নির্দিষ্ট চাপে এবং উচ্চ প্রবাহ হারে পরিচালনা করা হয়। এর মাধ্যমে রিয়্যাক্টর ভবনের ভেতরে একটি নিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরীণ প্লাবন বা ‘Internal Flooding’ সৃষ্টি করা হয়। এটি মূলত কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা ‘Extreme Accident’ এবং অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলার একটি বাস্তবসম্মত সিমুলেশন বা অনুকরণ।

এই প্রক্রিয়ায় কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে দুটি বিষয়—প্রথমত, স্প্রিংকলার থেকে নির্গত পানি যাতে কোনোভাবেই কনটেইনমেন্টের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষিত বা সেনসিটিভ জোনে প্রবেশ করতে না পারে (Hydraulic Isolation)। দ্বিতীয়ত, ভেতরের কোনো পানি যাতে বাহ্যিক পরিবেশে নির্গত হয়ে তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি তৈরি না করে। দীর্ঘ ১২ ঘণ্টার এই পরীক্ষায় ড্রেনেজ আইসোলেশন এবং ওয়াটার-টাইট ব্যারিয়ার সিস্টেমের কার্যকারিতা শতভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ফুয়েল পুল সেফটি ও কুলিং সক্ষমতা নিউক্লিয়ার ফুয়েল সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘Spent Fuel Pool’। কমপ্রিহেনসিভ টেস্টে এই পুলের পানির স্তর নিয়ন্ত্রণ, তাপ অপসারণ ক্ষমতা এবং কুলিং সিস্টেমের ধারাবাহিক অপারেশন পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, অভ্যন্তরীণ বন্যা বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ফুয়েল পুল নিরাপদ অপারেশনাল সীমার মধ্যে থাকে, যা তেজস্ক্রিয়তা রোধে একটি বড় সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করবে।

স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ও ফল্ট-টলারেন্স প্রযুক্তি আধুনিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘Automation’। কোনো প্রকার মানবিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই সেন্সরভিত্তিক সিগন্যাল ব্যবহার করে স্প্রিংকলার অ্যাকচুয়েশন, ভালভ অপারেশন এবং অ্যালার্ম সিস্টেমগুলো সচল হয়েছে। এটি প্রকল্পের ‘Redundancy’ (অতিরিক্ত সুরক্ষা স্তর) এবং ‘Fault-Tolerance’ (ত্রুটি সামলানোর ক্ষমতা) নীতির সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছে।

কমিশনিংয়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি এর আগে কোল্ড রান (Cold Run) ও হট রান (Hot Run) সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এই নিরাপত্তা পরীক্ষাটি ছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং পর্যায়ের একটি চূড়ান্ত কারিগরি মাইলফলক। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) মানদণ্ড এবং নকশাগত চাহিদা অনুযায়ী নিউক্লিয়ার সেফটি, অপারেশন ও ইঞ্জিনিয়ারিং টিম পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করেছে। এই পরীক্ষার সফল সমাপ্তি মূলত রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের পথকে নিষ্কণ্টক করল।

পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক ক্লাবে যুক্ত হওয়ার পথে রয়েছে। আজকের এই নিরাপত্তা পরীক্ষা সফল হওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আসার লক্ষ্যমাত্রায় আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।

Tags: nuclear power rooppur nuclear safety test fuel loading npcbl update reactor building containment integrity commissioning stage technical milestone power energy