চুক্তি বাতিলের কারণ ও রাশিয়ার অবস্থান
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ২০১০ সালে স্বাক্ষরিত ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তিটির মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) শেষ হচ্ছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চুক্তির আওতায় ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক ওয়ারহেডের সীমা আরও ১২ মাস বজায় রাখার জন্য প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সাড়া দেয়নি। বিবৃতিতে মস্কো আরও উল্লেখ করেছে, “আমরা ধরে নিচ্ছি, নিউ স্টার্ট চুক্তির পক্ষগুলো আর এই চুক্তির আওতায় কোনো বাধ্যবাধকতা বা সমমর্যাদার ঘোষণায় আবদ্ধ নয়। আমাদের প্রস্তাবগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান ভুল এবং দুঃখজনক।”
নিউ স্টার্ট চুক্তির মূল বিষয়বস্তু
‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তিটি কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের ওপর সীমা আরোপ করেছিল। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামরিক ও শিল্পকেন্দ্রে আঘাত হানার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে এমন অস্ত্র ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা ছিল। এটি ছিল ১০ বছর মেয়াদি চুক্তি, যা ২০১০ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভের স্বাক্ষরের পর ২০১১ সালে কার্যকর হয়। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দায়িত্ব নেওয়ার পর এর মেয়াদ আরও পাঁচ বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছিল।
অস্ত্র প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির শঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার ফলে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বাড়াতে এবং শত শত অতিরিক্ত কৌশলগত পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েন করতে পারবে। এতে লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ থাকলেও বাস্তবায়নে সময় লাগবে। ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের নিউক্লিয়ার ইনফরমেশন প্রজেক্টের সহযোগী পরিচালক ম্যাট কর্ডা রয়টার্সকে জানান, চুক্তি না থাকলে উভয় পক্ষই তাদের মোতায়েনকৃত ক্ষেপণাস্ত্র ও ভারী বোমারু বিমানে শত শত অতিরিক্ত ওয়ারহেড যুক্ত করতে পারবে। সবচেয়ে চরম পরিস্থিতিতে এতে তাদের বর্তমান অস্ত্রভাণ্ডারের আকার প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রের ৯০ শতাংশেরও বেশি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের দখলে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রাশিয়ার কাছে ৪ হাজার ৩০৯টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩ হাজার ৭০০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড ছিল।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সতর্কবার্তা
মস্কোর এই ঘোষণার পর জাতিসংঘ নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়াকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি ‘গুরুতর মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, “অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর এই প্রথম আমরা এমন এক বিশ্বের মুখোমুখি হচ্ছি, যেখানে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর কোনো বাধ্যতামূলক সীমা নেই।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, কয়েক দশকের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভেঙে পড়া এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। তবে তিনি দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নতুন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগও দেখছেন। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী পোপ লিও রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চুক্তির সীমা বজায় রাখার জন্য জরুরি আবেদন জানান।