মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিয়ে ওমানের রাজধানী মাস্কাটে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকাল শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) দুই দেশের প্রতিনিধিরা এই টেবিলে মুখোমুখি হবেন। মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে তুরস্ক, মিশর ও কাতার ইতিমধ্যে আলোচনার একটি খসড়া কাঠামো (Framework) তৈরি করেছে, যেখানে ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে অত্যন্ত কঠোর কিছু শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, এই আলোচনার মূল লক্ষ্য কেবল পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও সামরিক তৎপরতা কমিয়ে আনা।
কঠিন শর্তের বেড়াজালে তেহরান
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চুক্তির কাঠামোতে ইরানকে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ (Uranium Enrichment) কার্যক্রম আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, ইরান আগামী তিন বছর কোনোভাবেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে না। এই তিন বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অত্যন্ত সীমিত পরিসরে মাত্র ১.৫ শতাংশ হারে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
বর্তমানে ইরানের কাছে মজুদ থাকা উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে মধ্যস্থতাকারীরা। সূত্রের খবর অনুযায়ী, তেহরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে। প্রস্তাবিত শর্তে এই বিশাল মজুদ তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তর করার কথা বলা হয়েছে, যাতে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে।
মিসাইল প্রযুক্তি ও প্রক্সি যোদ্ধাদের ভবিষ্যৎ
কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, আলোচনায় বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল (Ballistic Missile) এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। প্রস্তাবিত কাঠামোতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ইরানকে হিজবুল্লাহ এবং হুতির মতো সশস্ত্র বাহিনীগুলোকে সব ধরনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বন্ধ করতে হবে।
ওয়াশিংটন দাবি করছে, ইরানকে কেবল মিসাইল ব্যবহার বন্ধ করলেই চলবে না, বরং তাদের মিসাইল উৎপাদন (Missile Production) সীমিত করতে হবে এবং এগুলোর আঘাত হানার সীমা (Range) উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে হবে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এই খসড়া প্রস্তাবে।
‘অনাগ্রাসন চুক্তি’র নতুন সম্ভাবনা
আলোচনার টেবিলে একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ‘অনাগ্রাসন চুক্তি’ (Non-Aggression Pact) সই করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যদি এই চুক্তি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা হবে দশকের পর দশক ধরে চলা দুই দেশের শত্রুতা নিরসনে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তা (Regional Security) নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
অনিশ্চয়তার দোলাচল ও বৈশ্বিক প্রভাব
যদিও মধ্যস্থতাকারীরা এই বিশাল কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছেন, তবে ওয়াশিংটন বা তেহরান— কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে তাদের মতামত জানায়নি। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই দাবি করে আসছে যে, যেকোনো নতুন চুক্তিতে পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি ইরানের মিসাইল প্রোগ্রাম এবং আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনীগুলোর (Proxy Forces) বিষয়গুলো অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাস্কাটের এই আলোচনা যদি সফল হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার (Oil Market) এবং বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। তবে ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বিসর্জন দিয়ে এই কঠিন শর্তগুলো মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। ওমানের এই কূটনৈতিক তৎপরতা শেষ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে (Comprehensive Deal) পৌঁছাতে পারে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।