পারমাণবিক ইস্যুতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিনি সাফ জানিয়েছেন, ইরান তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (Ballistic Missile) কর্মসূচি নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনায় বসবে না এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ (Uranium Enrichment) কার্যক্রম থেকেও পিছিয়ে আসবে না। পারমাণবিক ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই তেহরানের এই অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।
নিজেদের অধিকারে অনড় পেজেশকিয়ান প্রশাসন
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরাঘচি বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের কোনো পরিকল্পনা প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকারের নেই। একে ইরানের নাগরিক ও সার্বভৌম অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, তেহরান তার শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এ বিষয়ে কোনো ‘Negotiation’ বা দরকষাকষির সুযোগ নেই। তবে পারমাণবিক উত্তেজনা প্রশমনে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে গ্রহণযোগ্য ও ‘আশ্বস্তকারী চুক্তি’ করতে ইরান এখনো প্রস্তুত।
সংলাপের শর্ত: হুমকি ও চাপমুক্ত পরিবেশ
আরাঘচি ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যেকোনো সফল সংলাপের জন্য হুমকি এবং ‘Maximum Pressure’ বা বাড়তি চাপ প্রয়োগের মানসিকতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, “ইরান শুধুমাত্র পারমাণবিক ইস্যু (Nuclear Issue) নিয়ে কথা বলছে। এর বাইরে আঞ্চলিক রাজনীতি বা ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার মতো অন্য কোনো বিষয় আলোচনার টেবিলে তোলা হবে না।”
মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার হুঁশিয়ারি
গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরাইলি এবং পরবর্তীতে মার্কিন যৌথ হামলার প্রেক্ষাপট টেনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আক্রমণ করার ইচ্ছা ইরানের নেই, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো (US Military Bases) তেহরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি যোগ করেন, “আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোতে আক্রমণ করব না; তবে তাদের মাটিতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানতে দ্বিধা করব না।”
ট্রাম্পের নতুন ‘শুল্ক অস্ত্র’ ও অর্থনৈতিক চাপ
কূটনৈতিক আলোচনার সমান্তরালে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নতুন নির্বাহী আদেশে (Executive Order) স্বাক্ষর করেছেন। এই আদেশ অনুযায়ী, বিশ্বের যেকোনো দেশ যদি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ইরান থেকে পণ্য বা পরিষেবা গ্রহণ করে, তবে সেই দেশের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক (Tariff) আরোপ করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসের মতে, এটি ইরানকে ঘিরে চলমান ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’রই একটি অংশ।
অবিশ্বাসের দোলাচলে তেহরান-ওয়াশিংটন সম্পর্ক
ওমানে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে ইরান ইতিবাচক বললেও ওয়াশিংটনের কণ্ঠে এখনো সন্দেহের সুর। পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের দাবি, ইরান তাদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করেনি, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। অন্যদিকে, তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং আত্মরক্ষামূলক। ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতি এবং আরাঘচির অনড় বক্তব্য—উভয়ই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অদূর ভবিষ্যতে এই দুই দেশের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ আরও ঘনীভূত হতে পারে।