ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় শান্তি ফেরার যে ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল, তা আবারও ধূলিসাৎ করে দিল ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত বছরের অক্টোবরে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি (Ceasefire Agreement) কার্যত অগ্রাহ্য করে গাজার বিভিন্ন প্রান্তে নতুন করে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। রোববারের (১৫ ফেব্রুয়ারি) এই নৃশংস হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় চিকিৎসা সূত্র।
‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখায় রক্তক্ষরণ
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজা উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিস আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রাথমিক শর্ত অনুযায়ী ইসরায়েলি সৈন্যদের উপত্যকার নির্দিষ্ট একটি সীমারেখার ওপারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যা ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখা হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক মহলের কাছে এই রেখাটি একটি অলিখিত ‘নিরাপদ অঞ্চল’ হিসেবে গণ্য হলেও ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেস (IDF) আজ সেই সীমানা লঙ্ঘন করে রক্তক্ষয়ী হামলা চালায়। খান ইউনিসের এই হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে চারজন ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে।
বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতেও চলল তান্ডব
অন্যদিকে উত্তর গাজার আল-ফালুজা এলাকায় মানবিক বিপর্যয় আরও ঘনীভূত হয়েছে। গাজার ঐতিহাসিক আল-শিফা হাসপাতাল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সেখানে বাস্তুচ্যুত সাধারণ মানুষের (Displaced Persons) মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে ব্যবহৃত একটি তাঁবুতে সরাসরি বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। সেখানেও প্রাণ হারিয়েছেন আরও চারজন ফিলিস্তিনি। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরবাড়ি ছেড়ে আসা এই অসহায় মানুষদের ওপর এমন অতর্কিত হামলাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে অভিহিত করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (IDF) সাফাই
হামলার বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। বরাবরের মতোই তারা এই অভিযানকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেছে। তাদের দাবি, উত্তর গাজার একটি ভবনে কয়েকজন ‘সশস্ত্র ব্যক্তি’ প্রবেশ করার পর সেখানে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে (Targeted Strike) হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া ‘হলুদ রেখা’ অতিক্রম করার সময় একজনকে ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করে হত্যা করার কথা স্বীকার করেছে আইডিএফ। তবে সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু নিয়ে তাদের বিবৃতিতে কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি।
লেবানন সীমান্তেও উত্তাপ
গাজার পাশাপাশি লেবানন সীমান্তেও আগ্রাসনের পরিধি বাড়িয়েছে ইসরায়েল। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর (Hezbollah) অস্ত্রাগার ও রকেট লঞ্চার সংরক্ষণের গুদাম লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইসরায়েলি সামরিক কমান্ড। যদিও লেবাননের অভ্যন্তরে এই হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ (Regional War) শুরুর আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় ইসরায়েলের এই ধারাবাহিক আগ্রাসন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় চলমান শান্তি প্রক্রিয়াকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বারবার চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করায় ইসরায়েলের ওপর বৈশ্বিক চাপ বৃদ্ধির দাবি জোরালো হচ্ছে।