বগুড়ায় তুচ্ছ ঘটনার জেরে হরিজন সম্প্রদায়ের যুবক সুনীল বাঁশফোড় (২৩) হত্যার ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে উত্তরবঙ্গের এই বাণিজ্যিক নগরী। জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সরব প্রতিবাদ জানিয়েছেন হরিজন সম্প্রদায়ের শত শত মানুষ। নিহতের মরদেহ নিয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় অবস্থান কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি তারা প্রশাসনের কাছে ২৪ ঘণ্টার ‘আল্টিমেটাম’ (Ultimatum) দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে মূল আসামিরা ধরা না পড়লে সারা দেশে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সাতমাথায় মরদেহ নিয়ে অবস্থান: স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন
বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরের সেউজগাড়ি সুইপার কলোনি থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ‘সাতমাথা’য় গিয়ে সমবেত হয়। আন্দোলনকারীরা সুনীলের মরদেহ রাস্তায় রেখে অবস্থান নিলে মুহূর্তেই শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ব্যস্ততম সড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।
বিক্ষোভকারীরা এরপর মিছিল নিয়ে বগুড়ার পুলিশ সুপারের (এসপি) কার্যালয় ঘেরাও করেন এবং সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করে স্লোগান দেন। পরবর্তীতে তারা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় চত্বরে গিয়ে পুনরায় সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের দাবি তুলে ধরেন।
তুচ্ছ অর্থের জন্য নৃশংসতা: যেভাবে প্রাণ হারালেন সুনীল
গত ১২ ফেব্রুয়ারি বগুড়া শহরের স্টেশন রোড এলাকায় সেন্ট্রাল মসজিদের সামনে এক বর্বরোচিত ঘটনার শিকার হন সুনীল বাঁশফোড়। অভিযোগ রয়েছে, অজ্ঞাত এক ব্যক্তি তাঁর কাছে ৫০০ টাকা চাঁদা (Extortion) দাবি করে। সুনীল সেই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র দিয়ে সুনীলের পেটে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি আঘাত করে পালিয়ে যায়।
গুরুতর জখম অবস্থায় তাঁকে প্রথমে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার পর গত সোমবার রাতে না ফেরার দেশে চলে যান এই যুবক। এই ঘটনায় সুনীলের বাবা বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
দেশজুড়ে ধর্মঘটের হুমকি: চরম সংকটে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম
বগুড়া জেলা হরিজন সম্প্রদায়ের সভাপতি দীপক রাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রকাশ্য দিবালোকে সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য একজন তরুণের জীবন কেড়ে নেওয়া হলো, অথচ পুলিশ এখনো মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এটি আমাদের সম্প্রদায়ের প্রতি চরম অবিচার। আমরা ২৪ ঘণ্টার সময় দিচ্ছি; এর মধ্যে প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা না হলে সারা দেশের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কাজ বন্ধ করে দেবেন।”
হরিজন সম্প্রদায়ের নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, তাঁদের এই কর্মবিরতি (Work Abstention) শুরু হলে শহরগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্যানিটেশন (Sanitation) ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়বে, যার দায়ভার নিতে হবে প্রশাসনকে।
পুলিশি তৎপরতা ও তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা
বিক্ষোভের মুখে পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তফা মঞ্জুর সাংবাদিকদের জানান, “পুলিশ ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। আমরা এরই মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পেয়েছি এবং অপরাধীকে শনাক্ত করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। আশা করছি খুব দ্রুতই আমরা আসামিকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হব।”
তবে পুলিশের এই আশ্বাসে সন্তুষ্ট নন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের মতে, ঘটনার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও খুনি কেন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক ন্যায়বিচারের (Social Justice) স্বার্থে দ্রুত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।