মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক বিস্ফোরক মোড় নিয়েছে। ইরানের শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (Ballistic Missile) ব্যবস্থায় বড় ধরনের সামরিক হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে ইসরাইল। তেল আবিব এখন কেবল হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘সবুজ সংকেতের’ অপেক্ষায় রয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি অনুযায়ী, যেকোনো মুহূর্তে এই হামলা শুরু হতে পারে।
হামলার নেপথ্যে জেনেভা আলোচনার ব্যর্থতা বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে ইসরাইলি সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কেএএন (KAN) এবং তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। মূলত জেনেভায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আলোচনা কোনো ইতিবাচক ফলাফল ছাড়াই শেষ হওয়ার পর এই সামরিক উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’ জানিয়েছে, ইরান তার নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ (Uranium Enrichment) বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দূরত্ব এখন চরম পর্যায়ে। এই মতপার্থক্য মেটানো আমেরিকার পক্ষে অসম্ভব বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
শনিবারের মধ্যেই কি শুরু হচ্ছে সংঘাত? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইরানের ওপর সম্ভাব্য সামরিক হামলার সময়সূচি নিয়ে তার শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাথে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। সিবিএস নিউজ (CBS News) জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী যেকোনো সময় ইরানে আঘাত হানতে প্রস্তুত। কর্মকর্তাদের মতে, চলতি সপ্তাহান্তেই অর্থাৎ শনিবারের মধ্যেই এই অভিযান শুরু করার সক্ষমতা রয়েছে তাদের। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই হামলা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো আদেশে স্বাক্ষর করেননি। রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার কথা বিবেচনায় নিয়ে হোয়াইট হাউস অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলছে।
সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও পেন্টাগনের কৌশল ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা (Counter-attack) এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থে আঘাত আসার আশঙ্কায় পেন্টাগন (Pentagon) আগাম প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরাক ও সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলো থেকে বেশ কিছু মার্কিন সেনা ও কর্মীকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তাদের ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে যাতে হামলার পর ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে তাদের রক্ষা করা যায়।
ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক প্রস্তুতি ইসরাইলি সামরিক বাহিনী বা আইডিএফ (IDF) গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের যুদ্ধ প্রস্তুতির মূল্যায়ন সম্পন্ন করেছে। তাদের লক্ষ্যবস্তু মূলত ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবারই ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বিশ্বের জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন পেলে ইসরাইল যে বড় কোনো ঝুঁকি নিতে পিছপা হবে না, তা এখন স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সত্যিই এই হামলা বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কেবল ইরান-ইসরাইল সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সূচনা করতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। এখন সবার নজর ওয়াশিংটনের দিকে—প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের নির্দেশ দেবেন, নাকি কূটনৈতিক পথে ফেরার শেষ সুযোগ দেবেন?