মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে সংঘাতের পারদ চড়িয়ে এবার দক্ষিণ লেবাননে সরাসরি ‘স্থল অভিযান’ (Ground Offensive) শুরু করেছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF)। মঙ্গলবার (৪ মার্চ) ভোরে ইসরাইলি সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। তাদের দাবি, ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় বসতিগুলোকে হিজবুল্লাহর হামলা থেকে রক্ষা করতে এবং একটি স্থায়ী ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ (Security Zone) গড়ে তুলতেই এই অনুপ্রবেশ।
সীমানা পেরিয়ে লেবাননে ইসরাইলি পদাতিক বাহিনী ইসরাইলি সামরিক কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর শক্তিশালী ৯১তম ডিভিশন ইতিমধ্যে দক্ষিণ লেবাননের বেশ কিছু কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নিয়েছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো সীমান্তে হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো (Infrastructure) ধ্বংস করা। ইসরাইলের দাবি, হিজবুল্লাহ যাতে ভবিষ্যতে কোনোভাবেই ইসরাইলি ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ (Infiltration) করতে না পারে, সেজন্যই তারা এই অতিরিক্ত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করছে। গত কয়েক মাস ধরে বিমান হামলা ও আর্টিলারি শেলিংয়ের পর এই স্থল অভিযানকে যুদ্ধের এক নতুন ও ভয়াবহ পর্যায় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
হিজবুল্লাহর পাল্টা প্রতিরোধ ও রকেট বৃষ্টি ইসরাইলি স্থল অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই পাল্টা আঘাত হেনেছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা উত্তর ইসরাইল এবং ইসরাইল অধিকৃত সিরিয়ার গোলান মালভূমিতে (Golan Heights) অবস্থিত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে একযোগে রকেট ও ড্রোন (Drone) হামলা চালিয়েছে। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা সংঘাত ও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিবাদে এই প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে হিজবুল্লাহর দাবি। তাদের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ড্রোনগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে বলে জানানো হয়।
খামেনির প্রয়াণ ও অগ্নিগর্ভ মধ্যপ্রাচ্য লেবানন সীমান্তের এই উত্তেজনা মূলত একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের অংশ। উল্লেখ্য যে, গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্য বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
ইরান ইতিমধ্যে ইসরাইল এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনকৃত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র (Missile) হামলা শুরু করেছে, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিসেবে হিজবুল্লাহর এই তৎপরতা মূলত তেহরানের বৃহত্তর সামরিক কৌশলেরই একটি অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
মানবিক বিপর্যয় ও বৈশ্বিক উদ্বেগ স্থল অভিযান শুরু হওয়ায় দক্ষিণ লেবানন থেকে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার সংঘাত থামানোর আহ্বান জানালেও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত’ অভিযান চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।