বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) এখন আক্ষরিক অর্থেই এক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাবে এই অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়েছেন বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থা (IMO)। সংস্থার প্রধান আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ জানিয়েছেন, সংঘাতের কারণে ওই অঞ্চলে নৌ-বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় (Global Supply Chain)।
অচল হরমুজ: ২০ হাজার নাবিকের জীবন সংকটে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে এই রুটটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় কেবল পণ্যবাহী জাহাজের ২০ হাজার নাবিকই নন, বরং বিভিন্ন প্রমোদতরীর (Cruise Ship) আরও অন্তত ১৫ হাজার যাত্রী চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। জীবন রক্ষাকারী রসদ ও জ্বালানির অভাবে সেখানে এক মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তেহরানের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ ও চীনা জাহাজের অগ্রাধিকার সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা কেবল চীনের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে এই পথ দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেবে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির তথ্যমতে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC) সতর্ক করে বলেছে, অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করলে সেটিকে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র (Missile) বা ড্রোন (Drone) হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হবে। হরমুজ প্রণালীর ওপর তেহরানের এই ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ বিশ্বজুড়ে এনার্জি সিকিউরিটির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি বাজারে অগ্নিকাণ্ড: ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ১৫০ ডলারের পথে? হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে শুরু করেছে। ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, যদি এই পথ দিয়ে তেল সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকে, তবে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ মার্কিন ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে।
ইতিমধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই এলএনজির দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে এবং ইউরোপের দেশগুলোতে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। মার্কিন নৌবাহিনী এখন আর বাণিজ্যিক ট্যাংকারগুলোকে পাহারা (Escort) দিয়ে নিয়ে যাওয়ার অবস্থায় নেই, যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাচ্ছে।
ট্রাম্পের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ জ্বালানির এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কেবল আন্তর্জাতিক পর্যায়েই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও কম্পন ধরিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের অঙ্গরাজ্যগুলোতে সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের (Mid-term Election) মুখে এই জ্বালানি সংকট প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্য চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করবে। যুদ্ধের ব্যয় এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এখন অগ্নিপরীক্ষার সমান।
বর্তমানে লজিস্টিক (Logistics) খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি দ্রুত কোনো কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে এই অচলাবস্থা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে এক দীর্ঘমেয়াদী মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।