ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের একক ক্ষমতা খর্ব করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বুধবার (৪ মার্চ) মার্কিন পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে এ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। তবে সংঘাতের আবহে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক পদক্ষেপে প্রেসিডেন্টের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা চেয়ে বিরোধীদের আনা প্রস্তাবটি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ল।
সিনেটে শক্তি প্রদর্শন ট্রাম্পের পরমাণু ইস্যুতে চরম উত্তেজনার মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যৌথভাবে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। কোনো প্রকার আগাম ঘোষণা বা মার্কিন কংগ্রেসের সম্মতি ছাড়াই এই যুদ্ধ শুরু করায় ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন। বিরোধীরা প্রেসিডেন্টের এই স্বেচ্ছাচারী যুদ্ধ ক্ষমতা (War Powers) সীমিত করার দাবিতে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
বুধবার যুদ্ধের পঞ্চম দিনে সিনেটে অনুষ্ঠিত এই ভোটাভুটিতে ১০০ জন সদস্যের মধ্যে ৫২ জন প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেন। বিপরীতে ৪৭ জন সদস্য প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নিলেও তা পাসের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। এই পরাজয়ের ফলে ট্রাম্প প্রশাসন এখন কংগ্রেসের হস্তক্ষেপ ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক পরিকল্পনা চালিয়ে যাওয়ার আইনি বৈধতা বজায় রাখল।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ও ধ্বংসযজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই যৌথ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury)। এই অভিযানে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা, দুটি বিশাল বিমানবাহী রণতরি (Aircraft Carrier) এবং অত্যাধুনিক বোমারু বিমান অংশ নিচ্ছে। বুধবার যুদ্ধের তীব্রতা কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যার প্রভাব কেবল ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; হামলা জোরদার করা হয়েছে লেবাননেও।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানে নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যে এক হাজার ছাড়িয়েছে। এমনকি যুদ্ধের আঁচ পৌঁছেছে দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলেও। শ্রীলঙ্কার উপকূলে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজে মার্কিন সাবমেরিন থেকে টর্পেডো হামলা চালানো হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে, যেখানে অন্তত ৮৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
ইরানের পাল্টা আঘাত: লক্ষ্য মার্কিন ঘাঁটি ও কনস্যুলেট বসে নেই ইরানও। মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ ও সামরিক স্থাপনাগুলোতে শক্তিশালী পাল্টা হামলা শুরু করেছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC)। কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ সামরিক স্থাপনা ‘আল-উদেইদ’ ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল (Ballistic Missile)। একই সঙ্গে দুবাইয়ে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেটে বিস্ফোরক ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ইরানি বাহিনী কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর (Strait of Hormuz) পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
সংকটে মার্কিন রণকৌশল: ইরাক যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ ঝুঁকি? যুদ্ধের এই ক্রমবর্ধমান বিস্তার মার্কিন প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং অস্ত্রের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে আগামী শুক্রবার (৬ মার্চ) লকহিড মার্টিন (Lockheed Martin)-এর মতো বড় বড় অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। তবে সামরিক বিশ্লেষকরা এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জয় নিয়ে সন্দিহান।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘স্টিমসন সেন্টার’-এর গবেষক ক্রিস্টোফার প্রেবল আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে বলেছেন, এটি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ নয়। ইরান ভৌগোলিকভাবে ইরাকের চেয়ে প্রায় চার গুণ বড়। পুরো দেশজুড়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রাউন্ড অপারেশন (Ground Operation) চালানোর মতো পর্যাপ্ত সেনা ও রসদ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। ফলে স্থল অভিযানে গেলে ট্রাম্প প্রশাসন এক দীর্ঘমেয়াদী এবং ভয়াবহ চোরাবালিতে আটকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।