ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের গ্লোবাল আইকন হিসেবে তিনি পরিচিত। নিউজিল্যান্ডের জার্সি গায়ে হোক কিংবা বিশ্বের নামিদামি লিগ— জিমি নিশাম মানেই মাঠের ভেতরে ও বাইরে এক ভিন্ন আমেজ। সর্বশেষ বিপিএলে রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের হয়ে মাঠ মাতানো এই কিউই অলরাউন্ডার বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বড় মঞ্চে। সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন বিপিএল, বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি, বিশ্বকাপ জয়ের আক্ষেপ এবং কেন উইলিয়ামসনের মতো লিজেন্ডারি ক্রিকেটারের সাথে ড্রেসিংরুম শেয়ার করার অভিজ্ঞতা নিয়ে।
বিপিএল ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ব্যস্ততা
বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় লিগেই নিশামের পদচারণা রয়েছে। বিপিএল-কে তিনি ঠিক কোন অবস্থানে রাখেন? এমন প্রশ্নের জবাবে নিশাম বলেন, "বিপিএল অবশ্যই তালিকার ওপরের দিকে থাকবে। এখানকার ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো বিশ্বমানের বিদেশি ক্রিকেটার (Foreign Recruits) আনার ক্ষেত্রে কোনো আপস করে না। ক্রিকেটের মানও বেশ উন্নত, যা একজন পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে আমি সবসময় উপভোগ করি।"
প্রচুর ভ্রমণে ক্লান্তি আসে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে নিশাম বেশ রসিকতা করেই বলেন, "আসলে এখনকার ক্রিকেটাররা অনেক সুবিধা পান। আমরা বেশিরভাগ সময় 'Business Class' ট্রাভেলে অভ্যস্ত, যেখানে বিশ্রাম নেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে। তাছাড়া নিউজিল্যান্ড ভৌগোলিক কারণে অন্য দেশ থেকে অনেক দূরে, তাই প্রচুর ক্রিকেট খেলতে চাইলে ভ্রমণ আমাদের জীবনের অংশ হয়েই যায়।"
বাংলাদেশের উইকেট ও স্পিন খেলার পাঠশালা
বিদেশি ব্যাটারদের জন্য বাংলাদেশের কন্ডিশন সবসময়ই এক গোলকধাঁধা। তবে ইংল্যান্ডের ডেভিড মালান একবার বলেছিলেন, স্পিন খেলা শিখতে হলে তরুণদের বাংলাদেশে আসা উচিত। নিশামও সেই মতের সাথে একমত পোষণ করলেন।
নিশাম ব্যাখ্যা করেন, "২০১৩-১৪ সালের দিকে আমি যখন প্রথম বাংলাদেশে আসি, তখনই বুঝেছিলাম এখানকার স্পিন খেলার ব্যাকরণ আলাদা। এখানে বল 'Low' থাকে, মাঝে মাঝে 'Skid' করে আবার বাউন্সটাও আনপ্রেডিক্টেবল। নিউজিল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ায় আপনি চাইলেই লং-অনের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারতে পারেন, কিন্তু এখানে 'Sweep' বা 'Reverse Sweep' এবং 'Strike Rotation' বেশি কার্যকর। তাই স্পিন শেখার জন্য বাংলাদেশ সত্যিই দুর্দান্ত এক জায়গা।"
মুস্তাফিজ বন্দনা ও বাংলাদেশ দল প্রসঙ্গ
বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের 'পোস্টার বয়' মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে নিশাম বেশ উচ্ছ্বসিত। তার মতে, ফিজ একজন 'Smart Operator'। নিশাম বলেন, "মুস্তাফিজ দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে (Franchise Cricket) সফল। আইপিএল নিলামে তার যে চাহিদা দেখা যায়, তা থেকেই প্রমাণিত সে কত বড় মাপের বোলার। তার বিপক্ষে খেলার সময় সবসময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।"
তবে বাংলাদেশ দল বা তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়ে খুব বেশি বিশ্লেষণ করতে নারাজ এই কিউই তারকা। পেশাদারত্বের খাতিরে তিনি কেবল নিজের খেলাতেই মনোনিবেশ করতে পছন্দ করেন বলে জানান।
বিশ্বকাপের আক্ষেপ ও সেই ভাইরাল টুইট
২০১৯ এবং ২০২১—দুটি বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে তীরে এসে তরী ডুবেছে নিউজিল্যান্ডের। সেই যন্ত্রণা কি এখনও তাড়া করে বেড়ায়? নিশাম বলেন, "বিশ্বকাপ জেতা একজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। আমরা গত এক দশকে অনেক ভালো করেছি। শিরোপা জিততে না পারাটা বেদনার, তবে প্রতিটি নতুন টুর্নামেন্ট আমাদের জন্য নতুন সুযোগ। এই হারগুলো এখন আমাদের কাছে বড় অনুপ্রেরণা।"
২০১৯ বিশ্বকাপের সেই বিখ্যাত টুইট—যেখানে তিনি বাচ্চাদের ক্রিকেট থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন—সেটি নিয়ে নিশাম হাসিমুখে বলেন, "ওটা ছিল নিছক মজার ছলে করা এক টুইট। হারের হতাশায় ওই মুহূর্তে আমার মনের অবস্থাটা প্রকাশ পেয়েছিল। ভাবিনি বছর সাতেক পরেও এটা নিয়ে মানুষ প্রশ্ন করবে।"
কেন উইলিয়ামসন: নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের 'গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম'
নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের ধ্রুবতারা কেন উইলিয়ামসনকে নিয়ে নিশামের শ্রদ্ধাবোধ আকাশচুম্বী। উইলিয়ামসনের শান্ত মেজাজ ও নেতৃত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, "কেন নিউজিল্যান্ডের সর্বকালের সেরা ব্যাটারদের একজন। তাকে এবং রিচার্ড হ্যাডলিকে একই কাতারে রাখা যায়। সে ফলাফলের চেয়ে প্রক্রিয়ার ওপর বেশি জোর দেয়। ওয়ানডে এবং টেস্টের জন্য নিজেকে ফিট রাখতে সে এখন টি-টোয়েন্টি থেকে কিছুটা দূরে থাকছে, যা তার ক্যারিয়ারকে আরও দীর্ঘায়িত করবে। নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের জন্য সে এক অমূল্য সম্পদ।"
নিশামের এই সোজাসাপ্টা ও পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি কেবল তার ক্রিকেটীয় জ্ঞানকেই প্রকাশ করে না, বরং একজন বিশ্বমানের ক্রিকেটারের মানসিক কাঠামোর প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলে।