• আন্তর্জাতিক
  • ইরান যুদ্ধের নবম দিন: তেল শোধনাগারে ইসরাইলি আঘাত, ট্রাম্পের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ বার্তা

ইরান যুদ্ধের নবম দিন: তেল শোধনাগারে ইসরাইলি আঘাত, ট্রাম্পের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ বার্তা

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
ইরান যুদ্ধের নবম দিন: তেল শোধনাগারে ইসরাইলি আঘাত, ট্রাম্পের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ বার্তা

তেহরান উপকণ্ঠে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, স্কুলছাত্রসহ ১৬০ জনের মৃত্যু এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের ঘোষণা—আগ্রাসনের নবম দিনে রণক্ষেত্র এখন আরও উত্তপ্ত।

ইরান ও মার্কিন-ইসরাইল জোটের মধ্যকার সংঘাত রোববার (৮ মার্চ) নবম দিনে পদার্পণ করেছে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়ে এবার ইরানের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে আঘাত হেনেছে ইসরাইল। তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনায় (Strategic Installations) হামলা জোরদার করার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো তেল শোধনাগারকে লক্ষ্যবস্তু করেছে তেল আবিব। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে।

জ্বালানি অবকাঠামোয় প্রথম বড় আঘাত

যুদ্ধের নবম দিনে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF)। শনিবার রাতে তেহরানের শহরান এলাকায় অবস্থিত একটি বিশাল তেল ডিপোতে ভয়াবহ হামলা চালায় তারা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, ডিপো থেকে আগুনের লেলিহান শিখা ও কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে আকাশ। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা এমন জ্বালানি সংরক্ষণাগার ধ্বংস করেছে যা ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর রসদ সরবরাহের মূল উৎস। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই আগ্রাসনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৩২ জনে।

ট্রাম্পের অনমনীয় অবস্থান ও রাজনৈতিক সংঘাত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর (Unconditional Surrender) আহ্বান জানিয়ে তাঁর অনমনীয় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। শনিবার রাতে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা বা আলোচনায় আগ্রহী নয়। ট্রাম্পের লক্ষ্য ইরানের সামরিক শক্তি ও নেতৃত্বকে সমূলে বিনাশ করা।

অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বহিঃশত্রুরা আঞ্চলিক বিভেদ সৃষ্টি করতে চাইছে। তবে এই বার্তার মধ্যেই একটি বড় ঘোষণা সামনে এসেছে। ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টের সদস্য আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ-মাহদি মিরবাঘেরি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরী নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং এ বিষয়ে একটি ‘সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত’ গৃহীত হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি ও বিশ্ব তেলের বাজারে অস্থিরতা

বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ (Strait of Hormuz) নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। ইরানি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, প্রণালিটি এখনো খোলা থাকলেও কোনো মার্কিন বা ইসরাইলি জাহাজ প্রবেশের চেষ্টা করলে তা ধ্বংস করা হবে। অন্যদিকে, যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের (Brent Crude Oil) দাম গত এক সপ্তাহে ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০২০ সালের মহামারির পর সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক রেকর্ড। হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ থাকায় বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন (Supply Chain) চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

স্কুলে হামলা: যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ

দক্ষিণ ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভয়াবহ বিমান হামলার খবর প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এই হামলায় কমপক্ষে ১৬০ জন নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই কোমলমতি শিক্ষার্থী। আল জাজিরার প্রাথমিক তদন্ত এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই হামলাটি সম্ভবত মার্কিন বাহিনী অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে (Deliberate attack) চালিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে স্পষ্ট ‘যুদ্ধাপরাধ’ (War Crime) হিসেবে তদন্ত করার দাবি জানিয়েছে।

ঞ্চলিক অস্থিরতা ও প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থান

ইরানি প্রেসিডেন্ট প্রতিবেশীদের আশ্বস্ত করলেও বাহরাইন, কাতার, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) তাদের ভূখণ্ডে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ এনেছে। বাহরাইনের একটি পানি শোধন প্ল্যান্ট এবং কুয়েতের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জিজিসি (GCC) দেশগুলো ইরানের এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

লেবানন ও ইরাক ফ্রন্টের সর্বশেষ

যুদ্ধের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে লেবানন ও ইরাকেও। বৈরুতের একটি হোটেলে ইসরাইলি বিমান হামলায় কুদস ফোর্সের অন্তত চারজন কমান্ডার নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। পাল্টা জবাবে হিজবুল্লাহর হামলায় দুই ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, উত্তর ইরাকে একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে কুর্দি পেশমার্গা বাহিনী।

মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের (National Intelligence Council) এক গোপন প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বড় আকারের হামলা সত্ত্বেও ইরানের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা বা বিভক্ত বিরোধী গোষ্ঠীর পক্ষে দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী এবং আরও রক্তক্ষয়ী হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Tags: middle east donald trump war crime global economy drone strike iran war israel attack hormuz strait tehran blast oil price