মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে এক নতুন ও বিধ্বংসী অধ্যায়ের সূচনা করল ইরান। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে প্রথমবারের মতো নিজেদের অন্যতম শক্তিশালী ‘সেজ্জিল-২’ (Sejjil-2) ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তেহরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী। অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতির কারণে সমরবিদদের কাছে এটি ‘নৃত্যরত ক্ষেপণাস্ত্র’ (Dancing Missile) হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত।
ইরানের সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘প্রেস টিভি’র এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত রোববার যুদ্ধের ১৬তম দিনে এসে তেহরান এই হাইপারসনিক (Hypersonic) প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রটি ব্যবহার করেছে। শব্দের চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ বেশি গতিসম্পন্ন এই মারণাস্ত্রটি বর্তমান বিশ্বের অনেক অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে (Defense System) ফাঁকি দিতে সক্ষম।
কেন একে ‘নৃত্যরত ক্ষেপণাস্ত্র’ বলা হয়? সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর ‘হাই-অল্টিচ্যুড ম্যানুয়েভারিং’ (High-altitude maneuvering) সক্ষমতা। আকাশপথে এটি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দিক পরিবর্তন করতে পারে এবং একেবেঁকে লক্ষ্যবস্তুর দিকে অগ্রসর হয়। এর এই সর্পিল গতির কারণেই একে ‘নৃত্যরত’ বা ‘ড্যান্সিং মিসাইল’ বলা হয়ে থাকে। এই বৈশিষ্ট্যের ফলে শত্রুপক্ষের রাডার বা ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের পক্ষে একে শনাক্ত করা বা ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সেজ্জিল-২: প্রযুক্তির এক বিধ্বংসী সমন্বয় ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্রটি মূলত মাঝারি পাল্লার (Medium-range ballistic missile)। এর কারিগরি দিকগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
পাল্লা ও আঘাত ক্ষমতা: এটি সর্বোচ্চ ২০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে।
বিস্ফোরক বহন: দুই স্তরের (Two-stage) এই ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের শক্তিশালী ওয়ারহেড বা বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম।
সলিড ফুয়েল প্রযুক্তি: সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো এতে তরল জ্বালানির পরিবর্তে ‘সলিড ফুয়েল’ (Solid Fuel) ব্যবহার করা হয়। এর ফলে এটি অত্যন্ত অল্প সময়ের নোটিশে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব এবং দীর্ঘ সময় ব্যবহারের উপযোগী করে রাখা যায়।
ইতিহাস ও সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (CSIS)-এর তথ্য অনুযায়ী, সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ মিটার (৫৫ ফুট) এবং এর ওজন ১২ হাজার ৬০০ কেজি। যদিও ইরানের দাবি অনুযায়ী এর ওজন ও সক্ষমতা আরও অনেক বেশি হতে পারে। গত নব্বইয়ের দশকে এই প্রজেক্টের কাজ শুরু হলেও ২০০৮ সালে এর সফল পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হয়। সেজ্জিলের দুটি সংস্করণ রয়েছে—সেজ্জিল-১ এবং উন্নততর সেজ্জিল-২। রোববার তেহরান যে সেজ্জিল-২ ব্যবহার করেছে, তা ইরানের দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত যখন চূড়ান্ত উত্তেজনার দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন এই ধরণের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিকে আমূল বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা।