ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ এখন কার্যত অবরুদ্ধ। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন আতঙ্ক ছড়িয়ে তেহরান এই প্রণালীতে ‘Sea Mine’ বা সমুদ্র মাইন পেতেছে বলে দাবি করছে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই পথে মাইন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। তবে এই সংকটকালে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর সক্ষমতা এবং তাদের বিতর্কিত ‘Littoral Combat Ship (LCS)’ বহরের কার্যকারিতা।
শূন্য পকেটে মার্কিন নৌবাহিনী: মাইন অপসারণে বড় ঘাটতি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কয়েক দশক ধরে মার্কিন নৌবাহিনীর মাইন অপসারণের মূল শক্তি ছিল ‘Avenger-class’ মাইন-কাউন্টারমেজার জাহাজগুলো। কিন্তু বিস্ময়করভাবে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌঘাঁটি থেকে এই বিশেষায়িত জাহাজগুলোর শেষটি কেউ অবসরে পাঠানো হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সেই পুরনো জাহাজগুলো স্ক্র্যাপ বা ভেঙে ফেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফলে বর্তমানে এই অতি সংবেদনশীল অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কোনো বিশেষায়িত ‘Mine Sweeper’ বা মাইন অপসারণকারী জাহাজ নেই।
বিকল্প হিসেবে ‘LCS’ এবং যান্ত্রিক নির্ভরযোগ্যতার সংকট মার্কিন নৌবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাইন অপসারণের এই বিশাল দায়িত্ব এখন পালন করার কথা ‘Littoral Combat Ships’ বা এলসিএস বহরের। প্রায় ৩০টি জাহাজ নিয়ে গঠিত এই বহরটিকে মূলত দুটি বিশেষ ‘Mission’ পালনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এর বিশেষ ‘Hardware’ ও ‘Software Package’ প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে নিয়ে একে কখনো সমুদ্রপৃষ্ঠে যুদ্ধ (Surface Warfare), আবার কখনো মাইন প্রতিরোধের কাজে ব্যবহার করার কথা।
তবে ২০০৮ সালে এই জাহাজগুলো কমিশন হওয়ার পর থেকেই এর ‘Reliability’ বা নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকরা এই জাহাজগুলোকে ব্যঙ্গ করে ‘Little Crappy Ships’ বা ‘অকেজো ছোট জাহাজ’ বলে অভিহিত করেন। অনেক সামরিক বিশ্লেষকের মতে, এটি মার্কিন জাহাজ নির্মাণ ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্যর্থতা। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রথম দিকের বেশ কিছু এলসিএস জাহাজ খুব দ্রুতই সার্ভিস থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় পেন্টাগন।
সামরিক প্রয়োজন নাকি প্রচারণামূলক পদক্ষেপ? সিএনএন-এর নজরদারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পারস্য উপসাগরে অন্তত তিনটি এলসিএস জাহাজ মোতায়েন রয়েছে। তবে এগুলো ইরানের পাতা অত্যাধুনিক মাইন শনাক্ত ও ধ্বংস করতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে খোদ মার্কিন বিশেষজ্ঞদের মধ্যেই সন্দেহ রয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন এবং প্রখ্যাত প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক কার্ল শুস্টার মনে করেন, এই মুহূর্তে হরমুজ প্রণালীতে এলসিএস মোতায়েন করা একটি ‘Propaganda’ বা প্রচারণামূলক পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই নয়।
শুস্টারের মতে, “নৌবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই জাহাজগুলো ব্যবহার করতে চাইছেন কেবল এর ত্রুটিপূর্ণ নকশাকে কার্যকর প্রমাণ করতে এবং প্রজেক্টের পেছনে হওয়া বিশাল ‘Cost’ বা ব্যয়ের যৌক্তিকতা দেখাতে।” অর্থাৎ, সামরিক প্রয়োজনের চেয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ভাবমূর্তি রক্ষার লড়াই এখানে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ও ইরানের কৌশল ইরান খুব ভালো করেই জানে যে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামানো সম্ভব। মাইন পাতার মাধ্যমে তারা এই নৌপথকে এমনভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে যে, উচ্চ বীমা মাশুল ও নিরাপত্তার অভাবে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এই পথ এড়িয়ে চলতে বাধ্য হবে। অন্যদিকে, মার্কিন নৌবাহিনীর এলসিএস যদি এই মাইন সরাতে ব্যর্থ হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক আধিপত্য এবং বিশ্ব বাণিজ্যের নিরাপত্তা এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালীর এই ‘Infrastructural Warfare’ বা অবকাঠামো যুদ্ধ কেবল কামানের গোলার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন উন্নত প্রযুক্তি বনাম নৌবাহিনীর সক্ষমতার এক চরম পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে।