বগুড়ার শাহজাহানপুরে আলুর ভরা মৌসুমে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক ‘Extortion’ বা চাঁদাবাজি। উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের দুই প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে আলুর বস্তাপ্রতি ২০ টাকা করে চাঁদা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এক কৃষককে প্রকাশ্যে অপহরণের চেষ্টা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী কৃষক মেহেদী হাবীব আব্বাসী গত সোমবার শাহজাহানপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযুক্তরা হলেন—উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান মোমিন।
ঘটনার বিবরণ ও অপহরণ চেষ্টা অভিযোগকারী কৃষক মেহেদী হাবীব আব্বাসী জানান, গত ৮ মার্চ সন্ধ্যায় তিনি নিজ জমিতে উৎপাদিত আলু ট্রাকে করে হিমাগারে বা ‘Cold Storage’-এ নেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ট্রাকটি শাহজাহানপুর উপজেলার বীরগ্রাম বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে আইয়ুব আলী ও কামরুল হাসান মোমিনের নেতৃত্বে একদল যুবক গতিরোধ করে। তারা ট্রাকে থাকা প্রতি বস্তা আলুর বিপরীতে ২০ টাকা করে চাঁদা দাবি করেন।
মেহেদী হাবীব বলেন, "আমি এই অন্যায্য চাঁদা দিতে সরাসরি অস্বীকার করি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা আমাকে ট্রাক থেকে নামিয়ে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং চাঁদা না দিলে আমাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।" ওই সময় উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত পালিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী তাজনুর ইসলামও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, জনরোষের ভয়ে তারা শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি।
মাঠ থেকে ট্রাক—সবখানেই ‘টাকা চাই’ অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহজাহানপুরের বিভিন্ন ইউনিয়নে আলুবোঝাই ট্রাক বা ট্রাকে আলু লোড করার সময় স্বেচ্ছাসেবক দলের পরিচয়ে একদল যুবক নিয়মিত হানা দিচ্ছে। এমনকি জমিতে বস্তাবন্দি করার সময়ও তারা উপস্থিত হয়ে ‘Political Clout’ বা দলীয় প্রভাব খাটিয়ে টাকা দাবি করছে। বস্তাপ্রতি ২০ টাকা নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল ট্রাক ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা ‘Harassment’ বা হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। এই চাঁদাবাজির ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার ও দলীয় অবস্থান তবে চাঁদাবাজির এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলী। তিনি বিষয়টিকে ‘ভিত্তিহীন’ দাবি করে বলেন, "আমার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে একটি মহল মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে থানায় অভিযোগ দিয়েছে। আমি এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নই।"
এ বিষয়ে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সরকার মুকুল অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, "দলের পরিচয়ে কেউ চাঁদাবাজি বা কোনো অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হলে তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত ‘Organizational Action’ বা কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
পুলিশি তৎপরতা শাহজাহানপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম জানান, কৃষকের অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, "একজন কৃষক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে ‘Ground Investigation’ বা প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। সত্যতা পাওয়া গেলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কোনো পিছুপা হবে না।"
বগুড়ায় কৃষি প্রধান এই অঞ্চলে রাজনৈতিক দলের নেতাদের এমন তৎপরতায় সাধারণ চাষিদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় সচেতন মহল আশা করছে, পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে কৃষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।