মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত এক নতুন ও উদ্বেগজনক মোড় নিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Dubai International Airport) লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। বুধবার (১১ মার্চ) এই হামলায় বিমানবন্দরের সন্নিকটে দুটি ড্রোন আঘাত হানে। এতে এক বাংলাদেশি প্রবাসীসহ অন্তত চারজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
হামলার বিবরণ ও আহতদের তথ্য দুবাই মিডিয়া অফিস থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ইরানের ছোড়া দুটি ড্রোন বিমানবন্দরের অতি নিকটবর্তী এলাকায় বিধ্বস্ত হয়েছে। এই অতর্কিত হামলায় সেখানে অবস্থানরত এক বাংলাদেশি প্রবাসী এবং ঘানার দুই নাগরিক সামান্য আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। তবে ভারতীয় এক নাগরিকের আঘাত তুলনামূলক গুরুতর বা ‘Moderate’ পর্যায়ের বলে জানানো হয়েছে। হামলার পরপরই বিমানবন্দরে জরুরি অবস্থা জারি করা হলেও কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে, বর্তমানে বিমান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছর প্রায় ১০ কোটি যাত্রী যাতায়াত করা এই বিমানবন্দরটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান ‘Aviation Hub’ হিসেবে পরিচিত। এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন হামলার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক যাত্রী ও এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
অচল আকাশপথ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই সর্বাত্মক যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে আকাশপথ ব্যবস্থাপনায় এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশের ‘Airspace’ বা আকাশপথ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে এমিরেটস ও ইতিহাদের মতো জায়ান্ট এয়ারলাইন্সগুলো তাদের ‘Flight Schedule’ পরিবর্তন ও অসংখ্য ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে।
এই সংঘাতের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিশ্ববাজারে ‘Fuel Crisis’ বা জ্বালানি সংকট তীব্রতর হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম (Global Oil Prices), যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হামলার নতুন হুমকি আকাশপথের যুদ্ধের পাশাপাশি এবার অর্থনৈতিক যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিয়েছে ইরান। বুধবার তেহরানের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (Financial Institutions) লক্ষ্যবস্তু করা হবে। ইরানের একটি ব্যাংকে হামলার পর এই হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটির সামরিক কমান্ড।
ইরানের ‘Khatam al-Anbiya’ জয়েন্ট কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফিকারি বলেন, “সন্ত্রাসী মার্কিন সেনাবাহিনী এবং নিষ্ঠুর ইহুদিবাদী ইসরায়েল ইরানের ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন আঘাত হেনেছে। এর প্রতিশোধ হিসেবে আমরা এই অঞ্চলে তাদের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাতে বাধ্য হচ্ছি।” তিনি মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত সাধারণ মানুষকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
উদ্বেগের কেন্দ্রে দুবাই আন্তর্জাতিক যাত্রীদের বিবেচনায় বিশ্বের ব্যস্ততম এই বিমানবন্দরে হামলা সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য এক বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। যদিও আমিরাত সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে, তবে ইরানের এই নতুন যুদ্ধকৌশল এবং অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলার হুমকি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে (Geopolitics) এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি দ্রুত কোনো কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে এই সংঘাত বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিতে পারে।