ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)। মামলার প্রধান দুই অভিযুক্তের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফিলিপ সাংমা নামে আরও এক বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনিবার (১৪ মার্চ) ভোরে নদীয়া জেলার শান্তিপুর বাইপাস সংলগ্ন এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। গোয়েন্দাদের দাবি, ফিলিপ সাংমা মূলত একটি আন্তঃদেশীয় মানবপাচার বা ‘Human Trafficking Network’-এর সক্রিয় সদস্য।
গোয়েন্দা তৎপরতা ও গ্রেপ্তার অভিযান
গত ৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ এসটিএফ এই হত্যাকাণ্ডের দুই মূল হোতা ফয়সাল করিম ও আলমগীরকে গ্রেপ্তার করে। তাদের দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের (Interrogation) এক পর্যায়ে ফিলিপ সাংমার নাম উঠে আসে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে শান্তিপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ফিলিপকে ধরা হয়। আজই তাকে স্থানীয় আদালতে তোলা হলে অধিকতর তদন্তের স্বার্থে বিচারক তাকে পুলিশি হেফাজতে (Police Custody) পাঠানোর নির্দেশ দেন।
অনুপ্রবেশের রুট ও দালালচক্রের যোগসূত্র
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ফিলিপ সাংমা স্বীকার করেছেন যে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দালালি চক্রের সঙ্গে যুক্ত। মূলত অর্থের বিনিময়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার বা ‘Illegal Infiltration’-এ তিনি সহায়তা করতেন। ফিলিপ জানিয়েছেন, বাংলাদেশের হালুয়াঘাট সীমান্ত থেকে ভারতের মেঘালয়ের ডালুপাড়া সীমান্ত রুটটি তিনি ব্যবহার করতেন। তদন্তকারীদের দাবি, হাদি হত্যার প্রধান দুই অভিযুক্ত ফয়সাল ও আলমগীরকেও এই দুর্গম পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে ভারতে ঢুকতে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করেছিলেন ফিলিপ।
তদন্তে উঠে আসা চাঞ্চল্যকর তথ্য
এসটিএফ কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশে পুলিশি তৎপরতা বাড়লে ফিলিপ নিজেও অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেন এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করে ছিলেন। গোয়েন্দারা আরও জানতে পেরেছেন, ফয়সাল ও আলমগীর যখন পুনরায় বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছিলেন, তখন ফিলিপ তাদের জন্য নিরাপদ ‘Escape Route’ তৈরি করে দিচ্ছিলেন। এই গ্রেপ্তারের ফলে সীমান্তপারের অপরাধী নেটওয়ার্ক এবং তাদের ‘Logistics Support’ সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফিরে দেখা: শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড
২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট এলাকায় এক নৃশংস হামলার শিকার হন শরিফ ওসমান হাদি। নির্বাচনী প্রচারণার সময় চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে ঢাকা মেডিকেল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। গত ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই তরুণ রাজনৈতিক নেতা। এই হত্যাকাণ্ডটি বাংলাদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল এবং দীর্ঘ তদন্তের পর এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে এর প্রধান অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের খবর আসছে।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এই পদক্ষেপকে আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে একটি বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, ফিলিপ সাংমার সূত্র ধরে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা আরও কোনো মাস্টারমাইন্ডের সন্ধান পাওয়া যায় কি না।