মধ্যপ্রাচ্যে যখন যুদ্ধের দামামা তুঙ্গে, ঠিক তখনই বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের সদ্যঘোষিত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসতে চলেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। চলতি বছরেই তেহরানে এই উচ্চপর্যায়ের ‘Strategic Meeting’ অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে শনিবার (১৪ মার্চ) নিশ্চিত করেছেন মস্কোয় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি।
কাস্পিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে মেগা বৈঠক
রুশ সংবাদমাধ্যম ‘RIA Novosti’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি জানান, আগামী ১২ আগস্ট তেহরানে ক্যাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী দেশগুলোর শীর্ষ সম্মেলন (Caspian Sea Summit) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই সম্মেলনকেই দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম সাক্ষাতের মোক্ষম প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বেছে নেওয়া হতে পারে। যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগোয়, তবে এটিই হবে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির কোনো প্রভাবশালী বিশ্বনেতার সাথে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চলের পাঁচটি দেশের জন্য এই সম্মেলন কেবল একটি আঞ্চলিক আয়োজন নয়, বরং বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এটি রাশিয়ার জন্য ইরানের ওপর তাদের প্রভাব বজায় রাখা এবং পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে এককাট্টা হওয়ার একটি বড় সুযোগ।
নতুন নেতৃত্বের প্রথম অগ্নিপরীক্ষা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের শাসনতন্ত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ৯ দিনের মাথায় ৮ মার্চ তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি বেশ কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া তার প্রথম বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে যুদ্ধের নতুন নির্দেশনা প্রদান করেছেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে পুতিনের সাথে তার আসন্ন বৈঠকটিকে ‘Geopolitical Strategy’-র অংশ হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল।
১৫তম দিনে ইরান যুদ্ধ: খার্গ দ্বীপে ভয়াবহ হামলা
এদিকে, ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আজ ১৫তম দিনে পদার্পণ করেছে। যুদ্ধের তীব্রতা ক্রমে বাড়ছে। ইরানের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত খার্গ দ্বীপে (Kharg Island) গত রাতে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক হামলায় ইরানে এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৪৫০ জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও লেবাননের পরিস্থিতি
ইরান সীমান্তের বাইরেও যুদ্ধের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়েছে। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ১২ জন চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন। এই হামলার পর লেবাননে মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭৩ জনে, যার মধ্যে ১০৩ জন শিশু রয়েছে।
বর্তমান এই ভয়াবহ ‘Regional Crisis’ বা আঞ্চলিক সংকটময় মুহূর্তে পুতিন ও মোজতবা খামেনির বৈঠকটি কেবল দুই দেশের ‘Bilateral Ties’ বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে মজবুত করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বার্তা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, তেহরানের এই শীর্ষ সম্মেলন থেকে যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনের কোনো নতুন রোডম্যাপ বেরিয়ে আসে কি না।