বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম স্পর্শকাতর অঞ্চল পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীতে যখন যুদ্ধংদেহি পরিস্থিতি বিরাজ করছে, ঠিক তখনই ভারতের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির খবর নিয়ে এল ইরান। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চরম উত্তেজনার জেরে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি কার্যত অবরুদ্ধ থাকলেও, ভারতীয় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে বিশেষ নিরাপত্তায় চলাচলের অনুমতি দিয়েছে তেহরান। শনিবার (১৪ মার্চ) নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ‘ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভ’-এ এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাতহালি।
কৌশলগত জয়ে ভারতের বিশেষ অবস্থান
ইরানি রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাতহালি জানান, ইরান সরকার কয়েকটি ভারতীয় জাহাজকে হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) দিয়ে সীমিত কিন্তু নিরাপদ চলাচলের বিশেষ অনুমতি প্রদান করেছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থেই ঠিক কতগুলো জাহাজ এই সুবিধা পেয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করে জানাননি তিনি। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরানের এই পদক্ষেপকে ভারতের জন্য একটি বড় ‘Diplomatic Win’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এই নৌপথটি বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
নিরাপদে দেশে ফিরছে এলপিজি ট্যাংকার
ভারতের পর্যটন, নৌপথ ও জলপথ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব রাজেশ কুমার সিনহা ইরানের এই ঘোষণার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এরই মধ্যে দুটি ভারতীয় ‘LPG Tanker’ সফলভাবে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। শনিবার সকালেই জাহাজগুলো নিরাপদে প্রণালী পার হয়ে ভারতের পশ্চিম উপকূলের বন্দরের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। এর ফলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার (Energy Security) ক্ষেত্রে সাময়িক অনিশ্চয়তা কেটেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইউরোপের দৌড়ঝাঁপ ও জ্বালানি সংকট
ভারতের এই বিশেষ সুবিধা অর্জনের পাশাপাশি ইউরোপের দেশগুলোও এখন তেহরানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘Financial Times’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ফ্রান্স ও ইতালির মতো দেশগুলো সরাসরি ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। তারা চাইছে তাদের জাহাজগুলোকেও যেন নিরাপদ করিডোর দেওয়া হয়। তবে পশ্চিমা শিপিং কোম্পানিগুলো এখনও সম্ভাব্য নিরাপত্তার জন্য নৌবাহিনীর পাহারার দিকেই তাকিয়ে আছে।
মার্কিন হুঁশিয়ারি ও ডনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনা
এদিকে হরমুজ প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলের ট্যাংকারের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হবে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, নিরাপদ নৌ-চলাচলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ ‘Insurance’ স্কিম চালুর পরিকল্পনা করছে।
পাশাপাশি, জাপান থেকে ২,৫০০ মার্কিন মেরিন (Marines) সেনা মোতায়েনের একটি পরিকল্পনাও ট্রাম্প প্রশাসনের টেবিলে রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে কড়া বার্তা দিয়ে বলেছে, "আমরা ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছি। এভাবে নৌপথ বিঘ্নিত হলে আমরা ইরানের তেল অবকাঠামো (Oil Infrastructure) লক্ষ্যবস্তু করতে দ্বিধা করব না।" যদিও সরাসরি হামলার বিষয়ে হোয়াইট হাউস এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
সারসংক্ষেপ
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি তেল পরিবহণ করা হয়। এই সংকটের সমাধান না হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের পক্ষ থেকে ভারতকে দেওয়া এই বিশেষ ছাড় দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতাকেই নির্দেশ করছে।