ভারতের লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে পশ্চিমবঙ্গের 'Political Landscape' ওলটপালট করে দেওয়ার বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এক বিশাল জনসভা থেকে তিনি দাবি করেছেন, রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে এবং পতনের ‘কাউন্টডাউন’ শুরু হয়ে গেছে। দুর্নীতির অভিযোগ এবং স্বজনপ্রীতির প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে নজিরবিহীন ভাষায় আক্রমণ করেন তিনি।
ব্রিগেডে গেরুয়া প্লাবন ও দক্ষিণেশ্বরের ছোঁয়া
রোববার (১৫ মার্চ) সকাল থেকেই কলকাতার রাজপথ কার্যত গেরুয়া রঙে ছেয়ে গিয়েছিল। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিজেপি সমর্থকদের ভিড়ে জনসমুদ্রে পরিণত হয় ব্রিগেড ময়দান। এবারের সভার বিশেষ আকর্ষণ ছিল এর মঞ্চ সজ্জা। দক্ষিণেশ্বরের ঐতিহ্যবাহী কালীমন্দিরের আদলে তৈরি করা হয়েছিল বিশালাকার মোদির সভামঞ্চ, যা রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সভাস্থলে পৌঁছালে সমর্থকদের উল্লাসে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ।
তৃণমূলকে তীব্র আক্রমণ ও দুর্নীতির অভিযোগ
মঞ্চে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ভাষণ শুরু করেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূল সরকার পশ্চিমবঙ্গের মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করছে। মোদি বলেন, "তৃণমূলের অপশাসনের সময় শেষ হয়ে এসেছে। দুর্নীতি, তোলাবাজি আর স্বজনপ্রীতিতে জর্জরিত এই সরকার রাজ্যের উন্নয়নকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। মানুষ এখন পরিবর্তন চায়।" তৃণমূলের শাসনামলকে উন্নয়নের পথে অন্তরায় হিসেবে অভিহিত করে তিনি দাবি করেন, এবার পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ব্যালট বক্সেই এর মোক্ষম জবাব দেবে।
১৭ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন উপহার
রাজনৈতিক আক্রমণের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের জন্য বড় অংকের 'Development Projects' বা উন্নয়ন প্রকল্পের ডালি নিয়ে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী। জনসভার আগেই তিনি রাজ্যে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন পরিকাঠামো বা 'Infrastructure' প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করেন। এর মধ্যে রয়েছে রেল ও সড়কপথের আধুনিকায়ন এবং শিল্পোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। মোদি জোর দিয়ে বলেন, কেন্দ্র সরকার পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর, কিন্তু বর্তমান রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার কারণে অনেক কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে উত্তপ্ত মহানগরী
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ঘিরে কলকাতার নিরাপত্তা ছিল নিশ্ছিদ্র। তবে এর মধ্যেই প্রতিবাদের সুর শোনা গেছে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। তৃণমূল সরাসরি রাজপথে না নামলেও বেশ কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন কালো পতাকা প্রদর্শন করে ‘গো ব্যাক মোদি’ স্লোগান দেয়। বিশেষ করে পার্ক সার্কাস এলাকায় কালো কাপড় উড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরের তীব্র বিরোধিতা করা হয়।
এদিকে, জনসভাকে কেন্দ্র করে বিজেপি ও তৃণমূল সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। গিরীশ পার্কে রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজার বাসভবনের সামনে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে বিজেপি সমর্থকদের বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে বেশ বেগ পেতে হয়।
ভোটের সমীকরণে নয়া মোড়
পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচন দুই দফায় অনুষ্ঠানের ঘোষণা আসার পর মোদির এই সফরকে অত্যন্ত 'Strategic' বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। প্রধানমন্ত্রীর এই 'High-Voltage' জনসভা রাজ্যে বিজেপি কর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। অন্যদিকে, তৃণমূলের পক্ষ থেকে মোদির এই দাবিকে আমল না দিয়ে একে ‘নির্বাচনী চমক’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে, মোদির এই সফরের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পারদ যে কয়েক গুণ বেড়ে গেল, তা বলাই বাহুল্য।