টানা দুই মাসের শীতকালীন বিরতি ও রক্ষণাবেক্ষণ শেষে ফের প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে উত্তরের সমতলের চা বাগানগুলো। মার্চ মাসের শুরু থেকেই পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে কাঁচা চা পাতা সংগ্রহ (Tea Leaf Collection) ও প্রক্রিয়াজাতকরণ। তবে এবারের মৌসুমের শুরুটা অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় ব্যতিক্রম। গত আট বছরের সব রেকর্ড ভেঙে এবার কাঁচা চা পাতার বাজারমূল্য (Market Value) এখন তুঙ্গে, যা এই অঞ্চলের প্রান্তিক চাষিদের মধ্যে নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে।
রেকর্ড মূল্য ও চাষিদের উচ্ছ্বাস পঞ্চগড়ের বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে দেখা গেছে, বাগান পরিচর্যার পাশাপাশি কচি পাতা উত্তোলনে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিক ও মালিকরা। গত মৌসুমে প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতা যেখানে ২৫ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেখানে চলতি মৌসুমের শুরুতেই দাম দাঁড়িয়েছে ৩৮ থেকে ৪০ টাকায়। দামের এই উল্লম্ফনকে ২০১৭-১৮ সালের ‘চায়ের স্বর্ণযুগ’-এর প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার মৌলভীপাড়া গ্রামের চা বাগান মালিক নাসিম বলেন, "বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার আমরা অভাবনীয় দাম পাচ্ছি। ভালো দামের আশায় আমরা এখন বাগানগুলোর বাড়তি যত্ন নিচ্ছি। আশা করছি, পুরো মৌসুম জুড়ে এই দাম বজায় থাকবে।" তবে ভালো দামের খুশির মাঝেও ওজনে কর্তন এবং তথাকথিত ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ে আতঙ্কিত অনেক সাধারণ চাষি। তাদের দাবি, একটি স্বচ্ছ ও শোষণমুক্ত সাপ্লাই চেইন (Supply Chain) নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
সার সংকট ও উৎপাদনের নতুন মাইলফলক চায়ের দাম বাড়লেও চাষিদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে সারের অপ্রতুলতা। পৃথকভাবে চা বাগানগুলোর জন্য কোনো ফার্টিলাইজার অ্যালোকেশন (Fertilizer Allocation) বা আলাদা সার বরাদ্দ না থাকায় চাষিরা সংকটে পড়েছেন। বাগান মালিক তসলিম উদ্দীন জানান, সারের অভাবে সঠিক সময়ে পরিচর্যা ব্যাহত হচ্ছে। যদি সরকার এবং বাংলাদেশ চা বোর্ড (Bangladesh Tea Board) দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ চা বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় ২ কোটি ২ লাখ ৪২ হাজার ৫২ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ লাখ ৫১ হাজার কেজি বেশি। উৎপাদনের এই প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, সিলেটের পর উত্তরবঙ্গ এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ পঞ্চগড়ের জেডএইচ চা কারখানার ম্যানেজার মঞ্জুর আলম জানান, চাষিরা যদি কোয়ালিটি নিশ্চিত করে ভালো মানের কাঁচা পাতা সরবরাহ করেন, তবে কারখানায় উৎপাদিত চায়ের মানও উন্নত হয়। তিনি বলেন, "বর্তমানে চায়ের বাজার বেশ স্থিতিশীল। চাষিরা ভালো পাতা দিলে আমরা সর্বোচ্চ মানের চা তৈরি করে বাজারে সরবরাহ করতে পারব, যা সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলের অর্থনীতির ভ্যালু চেইন (Value Chain)-কে শক্তিশালী করবে।"
অন্যদিকে, বাংলাদেশ চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমির হোসেন জানান, সিলেট ও চট্টগ্রামের পর উত্তরাঞ্চল এখন দেশের তৃতীয় বৃহত্তম চা অঞ্চল হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছে। টানা পঞ্চমবারের মতো উৎপাদনের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থান ধরে রাখা এই অঞ্চলের জন্য বড় সাফল্য। তবে গুণগত মান বজায় রাখার বিষয়ে তিনি চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ ও টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
উত্তরের সমতলের এই চা বিপ্লব এখন কেবল পঞ্চগড়েই সীমাবদ্ধ নেই; ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট ও নীলফামারীতেও ছড়িয়ে পড়ছে। সঠিক নীতি সহায়তা ও নিরবচ্ছিন্ন সার সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সমতলের এই ‘সবুজ সোনা’ দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।