নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা মানুষের আনন্দযাত্রায় বিষাদ হয়ে দেখা দিয়েছে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের নজিরবিহীন স্থবিরতা। বুধবার (১৮ মার্চ) বিকেল থেকে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলগুলোতে ছুটি শুরু হওয়ার পর থেকেই মহাসড়কে নামে ঘরমুখো মানুষের ঢল। এই বিপুল জনস্রোত আর অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৃষ্টির বাগড়া। সব মিলিয়ে গাজীপুরের চন্দ্রা ও কালিয়াকৈর সংলগ্ন এলাকায় ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে, যা আসন্ন ঈদুল ফিতরের ঈদযাত্রাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
শিল্পাঞ্চল ছুটির পর জনসমুদ্র ও যাতায়াত সংকট গাজীপুর দেশের অন্যতম প্রধান Industrial Hub বা শিল্পাঞ্চল হওয়ায় আজ বিকেলে কয়েকশ পোশাক কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান একযোগে ছুটি ঘোষণা করে। ছুটি পাওয়ার পরপরই কয়েক লাখ শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকা থেকে উত্তরাঞ্চলের ২৬ জেলার প্রবেশদ্বার চন্দ্রা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। বিকেলের পর থেকেই চন্দ্রা বাস টার্মিনাল এলাকায় মানুষের পদচারণায় তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। এই বিপুল মানুষের চাপে মহাসড়কের Connectivity পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের ফিডার রোডগুলোতেও।
বৃষ্টির বাগড়া ও ২১ কিলোমিটারের স্থবিরতা বিকেল ৪টা নাগাদ হঠাৎ নামা বৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বৃষ্টির কারণে যানবাহনের গতি কমে যায় এবং মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে জলবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ও খাড়াজোড়া থেকে কোনাবাড়ী Flyover পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং চন্দ্রা-নবীনগর সড়কের আরও ৬ কিলোমিটার এলাকা মিলিয়ে মোট ২১ কিলোমিটার পথ এখন কার্যত স্থবির। যানবাহনের এই দীর্ঘ লাইন ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকায় যাত্রীদের মধ্যে নাভিশ্বাস উঠেছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ভোগান্তি এখন চরমে।
যাত্রীদের ক্ষোভ ও অতিরিক্ত ভাড়ার নৈরাজ্য মহাসড়কে আটকে থাকা যাত্রী আল মাহাদী জানান, "বৃষ্টির মধ্যে বাড়তি ভাড়া দিয়ে গাড়িতে উঠেছিলাম দ্রুত বাড়ি পৌঁছাব বলে। কিন্তু এক ঘণ্টায় গাড়ি মাত্র এক কিলোমিটার এগোতে পেরেছে। যে পথ পাড়ি দিতে ৬ ঘণ্টা লাগার কথা, এখন মনে হচ্ছে ১২ ঘণ্টাতেও গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না।" অন্যদিকে, সুযোগ বুঝে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে Fare Hike বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন আতাউর রহমান নামের এক যাত্রী। তার দাবি, বাসের সংকট থাকায় যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ ভাড়া দাবি করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন মহাসড়কের এই অচলবস্থায় Highway Police বা হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চালক ও যাত্রীরা। সোহান ট্রাভেলসের চালক মাহতাবুর রহমান বলেন, "বৃষ্টি নামার পর থেকে যানজট আরও প্রকট হয়েছে, কিন্তু সড়কে পুলিশের কার্যকর কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। এভাবে চললে যানজট ৫০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাবে।"
সরেজমিনে চন্দ্রা পুলিশ কন্ট্রোল রুমের পাশে পুলিশ সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা গেলেও, মূল সড়কে যানজট নিরসনে তাদের সক্রিয়তা ছিল নামমাত্র। নাওজোড় হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। দায়িত্বরত কয়েকজন পুলিশ সদস্য জানান, যানজট নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব অন্য ইউনিটের ওপর ন্যস্ত। মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের এমন অভাব ঈদযাত্রাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাত যত বাড়ছে, যাত্রী ও যানবাহনের চাপ ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃষ্টির কারণে সড়কের পিচ্ছিল অবস্থা এবং ট্রাফিক সিগন্যালের বিশৃঙ্খলায় ঈদযাত্রার প্রথম দিনেই গাজীপুর অংশে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা দ্রুত নিরসন করা না গেলে ভোগান্তি আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।