পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনুষ্ঠানিক ছুটি শেষ হচ্ছে আজ। ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী সোমবার (২৩ মার্চ) ছুটির শেষ দিন হলেও রাজধানীর চিরচেনা জনপদে আজ দেখা গেছে এক বিচিত্র ও বিপরীতমুখী চিত্র। একদিকে যেমন নাড়ির টানে শেষ মুহূর্তে ঢাকা ছাড়ছেন একদল মানুষ, ঠিক তেমনি নাড়ি ছিঁড়ে কর্মস্থলে যোগ দিতে প্রিয়জনের মায়া কাটিয়ে রাজধানীতে ফিরতে শুরু করেছেন অগণিত শ্রমজীবী ও চাকুরিজীবী। রাজধানী ঢাকার প্রবেশ ও বহির্গমন পথগুলোতে এখন উৎসবের আমেজ আর ফেরার তাড়া—উভয়ের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
বিলম্বে যাত্রা: স্বস্তির খোঁজে একদল সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালে (Terminal) গিয়ে দেখা যায় ঘরমুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড়। সাধারণত ঈদের আগে যে বিশাল ‘Holiday Rush’ দেখা যায়, তা এড়াতেই অনেকে পরিকল্পিতভাবে আজ যাত্রা করছেন। যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদের আগের কয়েক দিনের অসহনীয় যানজট, টিকিটের চড়া মূল্য এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্টের (Public Transport) চরম অব্যবস্থাপনা এড়াতে তারা এই দেরিতে বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
যাত্রীদের মতে, ভিড় কম থাকায় স্বস্তিতে ভ্রমণ করা যাচ্ছে এবং পরিবারের সঙ্গে বাকি থাকা আনন্দটুকু ভাগাভাগি করে নেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য। তবে বাসমালিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগের দিনগুলোর তুলনায় যাত্রীচাপ কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও শেষ মুহূর্তের এই চাপ সামলাতে তারা বাড়তি ট্রিপের ব্যবস্থা রেখেছেন।
কর্মস্থলে ফেরার তাড়া: রাজধানীতে পাল্টা স্রোত এদিকে মুদ্রার উল্টো পিঠে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। সরকারি ছুটি শেষ হওয়ায় মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) থেকেই দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি অফিস পুরোদমে চালু হচ্ছে। তাই কর্মব্যস্ত নগরবাসী আগেভাগেই ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা বাসগুলোতে ছিল যাত্রীদের ভিড়।
অনেকে জানিয়েছেন, মহাসড়কে বড় ধরনের কোনো যানজট (Traffic Jam) কিংবা দুর্ঘটনা এড়াতে তারা এক দিন আগেই ঢাকা ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশেষ করে পরিবারের বয়স্ক সদস্য ও শিশুদের নিয়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বস্তিকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এছাড়া কালকের ব্যস্ত দিনটি যেন সতেজভাবে শুরু করা যায়, সেজন্যই আগেভাগে ফেরা।
রেলপথে শিডিউল বিপর্যয় ও ভোগান্তি সড়কপথের যাত্রা কিছুটা সহনীয় হলেও রেলপথের যাত্রীদের কপালে দেখা গেছে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ট্রেনগুলো যেমন বিলম্বে স্টেশনে পৌঁছাচ্ছে, তেমনি ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোতেও ‘Schedule’ বিপর্যয়ের অভিযোগ তুলেছেন যাত্রীরা। সকালে কমলাপুর স্টেশনে অপেক্ষারত যাত্রীদের অনেকেই অভিযোগ করেন, বেশিরভাগ ট্রেনই নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে অনেক দেরিতে ছেড়েছে। এই শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে বিশেষ করে নারী ও শিশুদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। রেলওয়ে লজিস্টিকস (Logistics) ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেকের মধ্যেই ক্ষোভ দেখা গেছে।
পরিবহন ব্যবস্থা ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ পরিবহন বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল টিকেটিং (Digital Ticketing) ব্যবস্থার উন্নতি হলেও উৎসবের মৌসুমে বিপুল সংখ্যক যাত্রীর চাপ সামলানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন তৎপর থাকলেও বাড়তি যাত্রীর চাপে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ঈদের ছুটির এই শেষ মুহূর্তের যাতায়াত মূলত দুই ধরনের মানসিকতাকে ফুটিয়ে তুলেছে—একদল যারা ভিড় এড়িয়ে স্বস্তির খোঁজ করছেন, আর অন্যদল যারা সময়ের প্রয়োজনে ফেরার যুদ্ধে নেমেছেন। সব মিলিয়ে, আগামী ২৪ ঘণ্টা রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে এই ব্যস্ততা ও জনস্রোত অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।