জাতীয় রাজনীতিতে এক উত্তপ্ত বার্তার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হলো পবিত্র ঈদুল ফিতর। এনসিপি (NCP) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, গণঅভ্যুত্থানের মূলমন্ত্র ‘জুলাই সনদ’ (July Charter) বাস্তবায়নে কোনো ধরনের সাংবিধানিক অজুহাত মেনে নেওয়া হবে না। শনিবার (২১ মার্চ) সকালে রাজধানীর বেরাইদ এলাকার পূর্বপাড়া জামে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি সরকারের প্রতি এই কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
সংবিধান সংস্কারে অনীহা: ঈদের পর রাজপথে নামার ঘোষণা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের (Thirteenth National Election) পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল একটি শক্তিশালী ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ (Constitution Reform Commission) গঠন। নাহিদ ইসলাম গভীর হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, নির্বাচনের পর দ্রুততম সময়ে এই পরিষদের শপথ গ্রহণের কথা থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, “সরকার যদি অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পথে না হাঁটে, তবে ঈদের ছুটির পরপরই সংসদ এবং সংসদের বাইরে থেকে বিরোধী দল হিসেবে আমরা সর্বোচ্চ রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করব।” তার এই বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগামী দিনগুলোতে রাজপথের কর্মসূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
জুলাই সনদ বনাম সংবিধানের দোহাই নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল গত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং বিদ্যমান সংবিধানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিয়ে তার বিশ্লেষণ। তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, “সংবিধানের দোহাই দিয়ে জুলাই সনদকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, এই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান (Mass Uprising) কিন্তু বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামো মেনে শুরু হয়নি। জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকেই এর জন্ম।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে পুরাতন সংবিধানের আইনি বেড়াজাল দিয়ে নতুন জনমতকে রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। এটি বাস্তবায়নের জন্য আইনি ব্যাখ্যার চেয়ে সরকারের ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’ (Political Will) বেশি জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
সরকারের মূল্যায়ন: ধৈর্য ও গঠনমূলক সমালোচনা বিরোধীদলীয় এই নেতা সরকারের সমালোচনা করলেও কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছেন সময় দেওয়ার প্রশ্নে। তার মতে, একটি নতুন সরকারের গতিবিধি বা কার্যক্রম সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার জন্য মাত্র এক মাস সময় যথেষ্ট নয়। তিনি সরকারের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলেন, “সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ (Family Card) বিতরণসহ বেশ কিছু জনকল্যাণমূলক কাজ দ্রুততার সঙ্গে করেছে। আমরা তাদের আরও কিছুটা সময় দিতে চাই।”
তবে তিনি সতর্ক করে দেন যে, সংস্কার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। তাই সরকারের উচিত জনদাবি মেনে দ্রুত সংস্কারের রোডম্যাপ (Roadmap) স্পষ্ট করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেখছেন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সরকারকে দেওয়া একটি চূড়ান্ত সময়সীমা বা ‘আল্টিমেটাম’ হিসেবে। জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে সংবিধান পরিবর্তনের যে দাবি উঠেছে, তা সংসদীয় গণতন্ত্রের আগামী দিনে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিতে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ঈদের পর সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধান সংস্কার নিয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়।