বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরণের নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সপ্তাহ পার করার পর, সোমবার (২৩ মার্চ) ৪ মাসের সর্বনিম্ন স্তর থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে মূল্যবান এই ধাতুটি। একদিকে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে সামরিক হামলা স্থগিতের খবরে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ কমেছে, অন্যদিকে ডলারের মান দুর্বল হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয় বা ‘Safe Haven’ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা ফের বাড়তে শুরু করেছে।
রেকর্ড পতনের পর ঘুরে দাঁড়াল স্বর্ণ (Gold Market Rebound) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার স্পট মার্কেটে (Spot Market) স্বর্ণের দাম দিনের শুরুতে ৮ শতাংশের বেশি কমে প্রতি আউন্স ৪,০৯৭.৯৯ ডলারে নেমে গিয়েছিল। এটি ছিল গত কয়েক মাসের মধ্যে স্বর্ণের সবচাইতে বড় দরপতন। তবে লেনদেনের শেষ দিকে তা ০.৪ শতাংশ পুনরুদ্ধার করে ৪,৪৭০.৩৬ ডলারে স্থিতিশীল হয়। অন্যদিকে, মার্কিন স্বর্ণের ফিউচার (Gold Future) ২.২ শতাংশ কমে ৪,৪৭১.৬০ ডলারে অবস্থান করছে। উল্লেখ্য, গত শুক্রবার স্বর্ণ ১৯৮৩ সালের পর সবচাইতে খারাপ সাপ্তাহিক পারফরম্যান্সের রেকর্ড গড়েছিল।
ট্রাম্পের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ বার্তা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বাজারের এই আকস্মিক অস্থিরতার নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বার্তা। নিজের প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে এবং তিনি আপাতত দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর যেকোনো ধরণের সামরিক হামলা স্থগিত রেখেছেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম নাটকীয়ভাবে কমতে শুরু করে এবং ডলারের সূচকও দুর্বল হয়ে পড়ে। ডলার দুর্বল হওয়ার অর্থ হলো অন্য মুদ্রাধারীদের জন্য ডলারে নির্ধারিত স্বর্ণ কেনা তুলনামূলক সাশ্রয়ী হয়ে ওঠা, যা ধাতুটির চাহিদাকে ফের চাঙ্গা করেছে।
তবে ইরান এই দাবি নিয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ফার্স (Fars) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষ কোনো ধরণের আলোচনার খবর তাদের কাছে নেই। এই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে বাজারে অস্থিরতা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
তারল্য সংকট ও সুদের হারের প্রভাব (Liquidity and Interest Rates) হাই রিজ ফিউচারসের মেটালস ট্রেডিং বিভাগের পরিচালক ডেভিড মেগার জানান, বাজারে বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদী তারল্য সংকট বা ‘Liquidity Crisis’ চলছে। এছাড়া মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃক সুদের হার বাড়ানোর প্রত্যাশা স্বর্ণের দামের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। সাধারণত উচ্চ সুদের হার থাকলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের বদলে বন্ড বা সুদমূলক সম্পদে বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহী হন, কারণ স্বর্ণ ধরে রাখার জন্য ‘Opportunity Cost’ বা সুযোগ ব্যয় বেড়ে যায়। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি বা ‘Inflation’ থেকে সুরক্ষা পেতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীরা এখনো স্বর্ণের ওপরই আস্থা রাখছেন।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও ঐতিহাসিক দরপতন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে স্পট স্বর্ণের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। এমনকি গত ২৯ জানুযারি স্বর্ণের দাম যখন রেকর্ড সর্বোচ্চ ৫,৫৯৪.৮২ ডলারে পৌঁছেছিল, সেখান থেকেও বর্তমান দাম প্রায় ২০ শতাংশ নিচে। বাজারের এই ‘Volatility’ বা অস্থিরতা আরও কিছুদিন স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
রূপা ও অন্যান্য ধাতুর চিত্র স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সোমবার স্পট রূপার (Spot Silver) দাম ৩.৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৭০.০১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্যালাডিয়ামের দাম ৩.৪ শতাংশ বেড়ে ১,৪৫০.৭৯ ডলারে পৌঁছেছে। তবে প্লাটিনামের বাজার ছিল নিম্নমুখী, যার দাম ১.১ শতাংশ কমে ১,৯০১.৫৩ ডলারে নেমেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা কোন দিকে মোড় নেয় এবং মার্কিন সুদের হারের বিষয়ে নতুন কী ঘোষণা আসে—তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে স্বর্ণের চূড়ান্ত গন্তব্য।