দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় বরযাত্রীর গাড়ির সাইড দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট তুচ্ছ বিবাদ শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে বরযাত্রীদের এই সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন মোস্তফা কামাল (৩৮) নামে এক ট্রাকচালক। এই ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ জনতা ও পরিবহন শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করলে দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের চার জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা কয়েক ঘণ্টার জন্য অচল হয়ে পড়ে।
সংঘর্ষের সূত্রপাত: ওভারটেক ও হর্ন নিয়ে বিবাদ
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলা থেকে ৭-৮টি মাইক্রোবাসে করে একদল বরযাত্রী রংপুরের তারাগঞ্জের দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে কাহারোল উপজেলার তেরমাইল এলাকায় একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশাকে ‘ওভারটেক’ (Overtake) করার সময় সাইড দিতে বলে মাইক্রোবাসের চালক। দ্রুত গতিতে থাকা মাইক্রোবাসটি অটোরিকশাকে সাইড দিতে গিয়ে কিছুটা চাপ সৃষ্টি করলে দুই চালকের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। যদিও সেই মুহূর্তে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।
তবে ঘটনার রেশ সেখানেই শেষ হয়নি। সিএনজি চালক শফিকুল ইসলাম তাৎক্ষণিকভাবে মুঠোফোনে দশমাইল এলাকার স্থানীয় শ্রমিক ও পরিচিতদের বিষয়টি জানিয়ে বরযাত্রীর গাড়িগুলো আটকে দেওয়ার অনুরোধ করেন।
দশমাইলে রণক্ষেত্র ও মর্মান্তিক মৃত্যু
খবর পেয়ে স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য ও ট্রাকচালক মোস্তফা কামাল বেশ কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে দশমাইল শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসগুলো সেখানে পৌঁছালে তারা গতিরোধ করেন। এ সময় বরযাত্রীরা গাড়ি থেকে নেমে এলে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বাগবিতণ্ডা শুরু হয়।
পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং হাতাহাতি শুরু হয়। ধাক্কাধাক্কি ও মারধরের এক পর্যায়ে মোস্তফা কামাল মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার মাসুদ রানা জানান, মোস্তফা কামালকে ‘ইমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টে’ (Emergency Department) আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল।
মহাসড়ক অবরোধ ও জনরোষ
মোস্তফা কামালের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে কাহারোলের দশমাইল এলাকায় চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। বিক্ষুব্ধ জনতা ও পরিবহন শ্রমিকরা লাঠিসোটা নিয়ে দিনাজপুর-পঞ্চগড়-ঠাকুরগাঁও-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করে। এর ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটিতে কয়েকশ যানবাহন আটকা পড়ে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। বিক্ষুব্ধরা অভিযুক্ত বরযাত্রীদের গাড়িগুলো আটকে রেখে বিচারের দাবি জানাতে থাকে।
খবর পেয়ে কাহারোল থানার পুলিশ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। কাহারোল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শ্যামল কুমার জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং পুলিশ মহাসড়ক থেকে অবরোধকারীদের সরিয়ে দিয়েছে।
আইনি পদক্ষেপ ও বর্তমান অবস্থা
দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) আনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, “গাড়ি সাইড দেয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। নিহতের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হবে এবং এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ (Legal Action) নেওয়া হবে।”
এ ঘটনায় ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় ‘ট্রান্সপোর্ট ইউনিয়ন’ (Transport Union) এর পক্ষ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করা হয়েছে। পরিবহন শ্রমিকরা আলটিমেটাম দিয়েছেন যে, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার না করা হলে তারা বৃহত্তর আন্দোলনে নামবেন।