ক্যামেরুনের রাজধানী ইয়াউন্দেতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) ১৪তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে (Ministerial Conference) বাংলাদেশের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। গত বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ করণীয় শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে তিনি স্পষ্ট করেন যে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কার এখন সময়ের দাবি হলেও তা যেন সংস্থাটির মূল ভিত্তি বা ‘Core Principles’ ক্ষতিগ্রস্ত না করে। ১৬৬টি সদস্য দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী ও প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশের এই বার্তা বৈশ্বিক বাণিজ্য কূটনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সংস্কার বনাম অস্তিত্বের লড়াই: বাণিজ্যের মৌলিক কাঠামো রক্ষার দাবি
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির তার বক্তব্যে বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ডব্লিউটিও (WTO) সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দীর্ঘ সময় ও নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে গড়ে ওঠা বর্তমান ঐকমত্যভিত্তিক ও নিয়মভিত্তিক বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা (Multilateral Trading System) কোনোভাবেই সংস্কারের নামে দুর্বল করা উচিত নয়। মন্ত্রীর মতে, বিশ্বের অধিকাংশ উদীয়মান ও শক্তিশালী অর্থনীতি এই স্থিতিশীল কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। তাই সংস্কার প্রক্রিয়াটি হতে হবে অত্যন্ত সতর্কতামূলক, যাতে ব্যবস্থার অখণ্ডতা বজায় থাকে এবং পূর্বের অর্জনগুলো ধূলিসাৎ না হয়।
এলডিসি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থরক্ষা: এমএফএন ও ডিএফকিউএফ সুবিধা
বাণিজ্যনির্ভর উন্নয়নকে উৎসাহিত করাই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মূল লক্ষ্য। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির তার ভাষণে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (LDCs) অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ বা ‘MFN’ (Most Favored Nation) সুবিধা, শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার প্রবেশাধিকার বা ‘DFQF’ (Duty-Free Quota-Free) এবং বিশেষ ও পার্থক্যমূলক সুবিধা বা ‘S&DT’ (Special and Differential Treatment)—এই ব্যবস্থাগুলো বিশ্ব বাণিজ্যে সমতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য এই নীতিগুলো বাজারের প্রবেশাধিকার ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ‘Key Driver’ হিসেবে কাজ করছে।
ঐতিহাসিক সাফল্য ও বৈশ্বিক সংকট উত্তরণ
বিগত তিন দশকের অর্থনৈতিক চিত্র বিশ্লেষণ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট (Global Financial Crisis) এবং সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ (COVID-19) অতিমারির সময়টুকু বাদে উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি বর্তমান বাণিজ্য ব্যবস্থার কার্যকারিতারই এক বড় প্রমাণ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তথাকথিত সংস্কারের নামে এমন কোনো পরিবর্তন আনা উচিত হবে না যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ‘Market Barrier’ হিসেবে কাজ করবে। বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নয়নমুখী ফলাফল নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত এবারের সম্মেলনের মূল লক্ষ্য।
ক্যামেরুন সম্মেলনে বাংলাদেশের শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব
বিশ্বের ১৬৬টি দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই হাই-প্রোফাইল সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। এই দলে রয়েছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জেনেভাস্থ বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতি নির্ধারণে বাংলাদেশের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে প্রশংসিত হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যের শেষে একটি ‘Balanced and Institutional’ পদ্ধতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যেখানে অতি-নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ন্ত্রণহীনতা—উভয়কেই পরিহার করে সকলের জন্য সমান সুযোগ বা ‘Level Playing Field’ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।