চট্টগ্রাম মহানগরী ও আশপাশের উপজেলাগুলোতে ক্রমবর্ধমান লোডশেডিং জনজীবনকে প্রায় স্থবির করে তুলেছে। দিনের পর দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে নগরবাসীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, আবার কোথাও দিনে ৮-১০ বার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকাÑআগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, হালিশহর, বায়েজিদ ও পাহাড়তলীসহ বেশ কিছু এলাকায় লোডশেডিং এখন নিত্যদিনের চিত্র। অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করছেন, পূর্বঘোষণা ছাড়াই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তারা দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনা করতে পারছেন না। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না, বিশেষ করে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা পড়েছে বিপাকে। সন্ধ্যার পরপরই বিদ্যুৎ চলে গেলে মোমবাতি বা চার্জার লাইটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে শিল্পখাতেও। ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ছে। অনেক কারখানায় জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যার ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকলে কোল্ড স্টোরেজ, সুপারশপ ও রেস্টুরেন্টগুলোতে পণ্য সংরক্ষণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এতে খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
গ্রীষ্মের তাপদাহের মধ্যে লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে। ঘরে ফ্যান না চলায় শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। রাতের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকলে ঘুমহীন রাত কাটাতে হচ্ছে হাজারো পরিবারকে। হালিশহর এলাকার বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বলেন, প্রচÐ গরমে বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। রাতে ঘুমানো যাচ্ছে না, দিনে কাজেও সমস্যা হচ্ছে।” অন্যদিকে আগ্রাবাদের এক ব্যবসায়ী জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানের ফ্রিজ ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি চালানো যাচ্ছে না। এতে প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা দাবি করছেন, ধাপে ধাপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
নগরবাসীর দাবি, লোডশেডিংয়ের একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করা হোক, যাতে মানুষ আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে পারে। পাশাপাশি দ্রæত বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ সংকট নিরসনের আহŸান জানিয়েছেন তারা। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছে, ফলে পুরো চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা লোড ম্যানেজমেন্ট করছি। নির্দিষ্ট সময়সূচির মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান লোডশেডিংয়ের পেছনে রয়েছে কয়েকটি প্রধান কারণÑজ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ সংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত তাপমাত্রায় চাহিদা বৃদ্ধি এবং সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতা।
লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। বড় হাসপাতালগুলোতে ব্যাকআপ ব্যবস্থা থাকলেও ছোট ক্লিনিকগুলোতে সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না।