বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অন্যতম সফল পেসার ও সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলমের তোলা যৌন হয়রানির বিস্ফোরক অভিযোগে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এই গুরুতর পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবশেষে পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাদেরকে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কারা আছেন এই তদন্ত কমিটিতে?
বিসিবি এই স্পর্শকাতর বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এবং নিরপেক্ষ প্যানেল গঠন করেছে। কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি তারিক উল হাকিম। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের একমাত্র নারী পরিচালক রুবাবা দৌলা এবং বাংলাদেশ নারী ক্রীড়া সমিতির সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা। তাদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা এই তদন্তকে একটি স্বচ্ছ রূপ দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যেসব বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন জাহানারা
সম্প্রতি ফ্রিল্যান্স ক্রীড়া সাংবাদিক রিয়াসাদ আজিমের ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাহানারা তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তার মূল অভিযোগ নির্বাচক ও দলের তৎকালীন ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। জাহানারা দাবি করেন, ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ চলাকালে মঞ্জুরুল তাকে একাধিকবার কুপ্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তার সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করা হয় এবং তাকে নানাভাবে মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
শুধু তাই নয়, জাহানারা নারী ক্রিকেট বিভাগের সাবেক ইনচার্জ প্রয়াত তৌহিদ মাহমুদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ এনেছেন। তিনি জানান, বোর্ডের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা এই বিষয়গুলোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
বিসিবির ভূমিকা ও আগের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ
জাহানারার অভিযোগের তীর কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই নয়, বরং বোর্ডের তৎকালীন ব্যবস্থাপনার দিকেও। তিনি সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি তৎকালীন নারী বিভাগের চেয়ারম্যান শফিউল ইসলাম চৌধুরীকে একাধিকবার জানালেও তিনি কোনো স্থায়ী সমাধানের পথে না হেঁটে সাময়িকভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এমনকি বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরীকে লিখিতভাবে বিস্তারিত জানানোর পরেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এই পটভূমিতে, জাহানারার আনুষ্ঠানিক অভিযোগের প্রায় দুই দিন পর বিসিবির এই তদন্ত কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা বোর্ডের সভাপতির আইসিসি সভা থেকে দেশে ফেরার পর চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।
কে এই জাহানারা আলম?
৩২ বছর বয়সী জাহানারা আলম বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের একজন পথিকৃৎ। জাতীয় দলের হয়ে তিনি ৫২টি ওয়ানডে এবং ৮৩টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন এবং দেশের সফলতম পেসার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দলকে নেতৃত্বও দিয়েছেন তিনি। গত বছরের ডিসেম্বরের পর থেকে তাকে আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেখা যায়নি। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে থিতু হয়েছেন, যেখানে ক্লাব ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি কোচিংয়েও মনোনিবেশ করেছেন। জাহানারা আরও দাবি করেন, দলের অনেক ক্রিকেটারই এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, কিন্তু ক্যারিয়ারের ভয়ে বা অন্যান্য শঙ্কায় তারা মুখ খুলতে সাহস পান না। এই তদন্ত এখন বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভাবমূর্তি এবং নারী খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।