জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট ও রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি-তে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি এই রায় প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, যথাযথ প্রমাণ ও সাক্ষ্য পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে, এমন একটি উপযুক্ত ট্রাইব্যুনালে তিনি অভিযোগকারীদের মুখোমুখি হতে ভীত নন।
হাসিনার এই প্রতিক্রিয়া বিশ্ব গণমাধ্যমেও গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে, যা আল জাজিরার মতো সংবাদমাধ্যম এএফপির বরাত দিয়ে প্রচার করেছে।
ট্রাইব্যুনালের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণার পর শেখ হাসিনা তার বিবৃতিতে বিচারিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, "আমার বিরুদ্ধে ঘোষিত রায়গুলো একটি অনির্বাচিত সরকারের প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচালিত কারচুপিপূর্ণ একটি ট্রাইব্যুনাল থেকে দেওয়া হয়েছে, যার কোনো গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট (democratic mandate) নেই।"
তার মতে, এই বিচারিক প্যানেল এবং এর কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে পক্ষপাতদুষ্ট, যার মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করা। এর মাধ্যমে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গঠিত এই বিশেষ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার এবং নিরপেক্ষতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানালেন।
নির্ভীকভাবে অভিযোগ মোকাবিলার বার্তা বিবৃতিতে শেখ হাসিনা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে একটি স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য তার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, "যেখানে প্রমাণের ন্যায্যতা যাচাই করা যায়, সেরকম একটি উপযুক্ত ট্রাইব্যুনালে আমি অভিযোগকারীদের মুখোমুখি হতে ভীত নই।"
তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, বর্তমান ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল না এবং সেখানে সাক্ষ্যপ্রমাণ সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয়নি। তিনি একটি বিকল্প বিচারিক ব্যবস্থার অধীনে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগের দাবি তুলেছেন, যা তার সমর্থক এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঐতিহাসিক রায় ও অন্যান্য দণ্ডাদেশ এর আগে সোমবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
মামলার ২ নম্বর অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। তবে, ১ নম্বর অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে, মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে সত্য উন্মোচনে বিচারিক প্রক্রিয়াকে সহায়তা করায় সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই রায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যার প্রতিক্রিয়া এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে।