• আন্তর্জাতিক
  • শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড রায়: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন কূটনৈতিক উত্তাপ, বিশেষজ্ঞদের মত

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড রায়: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন কূটনৈতিক উত্তাপ, বিশেষজ্ঞদের মত

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড রায়: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন কূটনৈতিক উত্তাপ, বিশেষজ্ঞদের মত

ভারতে নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণায় গভীর অস্বস্তিতে নয়াদিল্লি; প্রত্যর্পণ না করার সিদ্ধান্তে জটিল হচ্ছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক।

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন

গত বছরের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। গত এক বছরে বাংলাদেশ একাধিকবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও ভারত তাকে প্রত্যর্পণ না করায় দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কূটনৈতিক অস্বস্তি চরমে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির মোড় এবং দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চলছে গভীর আলোচনা।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম Al Jazeera-এর এক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক তিন বিশেষজ্ঞ— মাইকেল কুগেলম্যান, শ্রীরাধা দত্ত এবং সঞ্জয় ভর্ধ্বাজ— ভারতের সামনে থাকা বাস্তবতা, কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সমীকরণের নানা দিক তুলে ধরেছেন।

ভারতের জন্য ‘গলার কাঁটা’ শেখ হাসিনা

ওয়াশিংটনভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক Michael Kugelman মনে করেন, নির্বাসিত অবস্থায় শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি চাপ বজায় থাকবে। তার মতে, শেখ হাসিনার উপস্থিতি এই দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে একটি 'কাঁটা'-র মতো বিঁধে থাকবে।

তবে তিনি এ-ও মনে করেন যে, ভারত তার পুরনো মিত্রদের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখার যে নীতিগত প্রতিশ্রুতি দেয়, হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া তারই প্রতিফলন। কুগেলম্যানের ধারণা, রাজনৈতিকভাবে এই সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য কিছু নতুন সুযোগও তৈরি করতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বংশভিত্তিক দলগুলো সংকটে পড়লেও পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় না। সেই কারণে Awami League-কে এখনই বাতিল করে দেওয়ার সময় আসেনি এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এই দলের ফিরে আসার সুযোগ থাকতে পারে।

ভারতের ‘অস্বস্তিকর’ অবস্থা ও নতুন সমীকরণের তাগিদ

ভারতের জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক Sriradha Dutta মনে করেন, শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারত বর্তমানে ‘এক অস্বস্তিকর অবস্থায়’ (Uncomfortable Position) পড়েছে। তিনি বলেন, ভারত এই বিষয়টি বুঝতে পারছে যে বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশ শেখ হাসিনার প্রতি ক্ষুব্ধ, কিন্তু তাকে আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে জায়গা করে দেওয়াও সম্ভব নয়।

অধ্যাপক দত্ত আরও উল্লেখ করেন, আদর্শ পরিস্থিতিতে ভারত চাইবে Awami League আবার ক্ষমতায় ফিরে আসুক, কারণ 'হাসিনা ভারতের জন্য সব সময়ই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিকল্প' ছিলেন। কিন্তু বর্তমান Reality হলো, ভারতকে বাংলাদেশে অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তার মতে, এখন ঢাকার অন্যান্য Stakeholders বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নতুন করে সাজানো দরকার। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই নাজুক অবস্থায় শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নটিকে কেন্দ্র করে সম্পর্ককে আরও জটিল না করে দুই দেশের এগিয়ে যাওয়া উচিত।

প্রত্যর্পণ ‘অসম্ভব’ কেন?

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক Sanjay Bharadwaj স্পষ্টভাবে জানান, শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট। তারা ঢাকার বর্তমান সরকারকে 'অ্যান্টি-ইন্ডিয়া' (Anti-India) হিসেবে দেখছে। তার মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায়, তারা প্রকাশ্যে ভারতের সমালোচনা করছে এবং হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য নয়াদিল্লিকেই দায়ী করছে।

অধ্যাপক ভর্ধ্বাজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে ভারত হাসিনাকে ফেরত দিলে তা হবে ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সেই শক্তিগুলোকেই 'বৈধতা দেওয়া', যা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। তিনি আরও বলেন, ২০১৩ সালের ভারত-বাংলাদেশ Extradition Treaty (প্রত্যর্পণ চুক্তি)-তে ‘রাজনৈতিক ব্যক্তি’র অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের ব্যতিক্রম রয়েছে এবং ভারত এই ধারাটিই প্রয়োগ করছে। এটি মূলত International Law এবং Diplomatic Protocol-এর অধীনেই গৃহীত একটি সিদ্ধান্ত।

বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও নতুন সমীকরণ

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শেখ হাসিনা ইস্যু সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা বাড়ালেও দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখনো ভাঙনের পর্যায়ে যায়নি। বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা (Border Security) এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ (Regional Connectivity) সহ গুরুত্বপূর্ণ Sector-গুলিতে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। তবে শেখ হাসিনা ইস্যুটি নিঃসন্দেহে দুই দেশের কূটনীতিতে একটি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে, ভারত বুঝছে যে তাদের ঢাকায় নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে এবং Foreign Policy-তে পরিবর্তন আনতে হবে।

Tags: political crisis sheikh hasina awami league death sentence india bangladesh foreign policy extradition treaty diplomatic tension geopolitical analysis