হ্যাম্পডেন পার্কের ঐতিহাসিক রাত গ্লাসগোর হ্যাম্পডেন পার্ক বহু ঐতিহাসিক ফুটবল ম্যাচের সাক্ষী। মঙ্গলবার রাতের পর সেই ইতিহাসে যুক্ত হলো আরও এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। প্রায় তিন দশকের দীর্ঘ খরা কাটিয়ে ফুটবল বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিল স্কটল্যান্ড। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এ দেখা যাবে স্কটিশদের। ইউরোপিয়ান কোয়ালিফায়ারের রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে ডেনমার্ককে ৪-২ গোলে হারিয়ে এই যোগ্যতা অর্জন করেছে তারা। এই জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, বরং অ্যান্ডি রবার্টসন, স্কট ম্যাকটমিনে, কিয়েরান টিয়ের্নিদের সোনালী প্রজন্মের হাত ধরে স্কটিশ ফুটবলের এক নতুন ভোরের ইঙ্গিত।
ম্যাকটমিনের অবিশ্বাস্য গোলে শুরু স্বপ্নের মতো এই রাতের শুরুটা অবশ্য কিছুটা স্নায়ুচাপের মধ্যেই হয়েছিল। ওয়ার্ম-আপের সময় চোট পেয়ে ছিটকে যান ডিফেন্ডার জন সুটার। কিন্তু ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজার তিন মিনিটের মধ্যেই সব উদ্বেগ উধাও হয়ে যায় এক জাদুকরী মুহূর্তে। ডান প্রান্ত দিয়ে বেন গ্যানন-ডোকের নিখুঁত ক্রস খুঁজে নেয় ড্যানিশ বক্সের ভেতরে থাকা স্কট ম্যাকটমিনেকে। গোলের দিকে পেছন ফিরে থেকেও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই মিডফিল্ডার এক অবিশ্বাস্য ওভারহেড কিকে বল জালে জড়ান। ড্যানিশ গোলরক্ষক ক্যাসপার স্মাইকেলের চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। এই গোলে হ্যাম্পডেন পার্কের গ্যালারি উল্লাসে ফেটে পড়ে।
তবে ম্যাচের ২০ মিনিটেই বড় ধাক্কা খায় স্কটল্যান্ড। একটি ক্রস ব্লক করতে গিয়ে হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে স্ট্রেচারে মাঠ ছাড়েন গ্যানন-ডোক। এর কিছুক্ষণ পরেই ডেনমার্কের রাসমুস হয়লুন্দ বল জালে পাঠালেও ফাউলের কারণে তা বাতিল হয়। প্রথমার্ধের বাকি সময় ড্যানিশরা আক্রমণের চাপ বাড়ালেও স্কটল্যান্ডের জমাট রক্ষণের কারণে আর কোনো গোল হয়নি।
বিতর্ক, লাল কার্ড এবং রুদ্ধশ্বাস প্রত্যাবর্তন দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে ডেনমার্ক। তাদের ধারাবাহিক আক্রমণের ফল মেলে একটি বিতর্কিত পেনাল্টি থেকে। গুসটাভ ইসাকসেন বক্সে পড়ে গেলে রেফারি প্রথমে ফাউল দেননি, কিন্তু VAR পর্যালোচনার পর পেনাল্টির সিদ্ধান্ত আসে। স্পট কিক থেকে গোল করে ডেনমার্ককে সমতায় ফেরান রাসমুস হয়লুন্দ।
ম্যাচের উত্তেজনা আরও বাড়ে যখন জন ম্যাকগিনকে ভয়ংকর ট্যাকল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ড্যানিশ ডিফেন্ডার রাসমুস ক্রিস্টেনসেন। দশ জনের ডেনমার্কের বিপক্ষে স্কটল্যান্ড আক্রমণের ধার বাড়াতে লরেন্স শ্যাঙ্কল্যান্ড এবং চে অ্যাডামসকে মাঠে নামায়। এর ফলও মেলে দ্রুতই। লুইস ফার্গুসনের কর্নার থেকে ভেসে আসা বল গোললাইনের সামনে পেয়ে যান শ্যাঙ্কল্যান্ড এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ে দলকে এগিয়ে দেন ২-১ গোলে।
কিন্তু নাটকীয়তার তখনো অনেক বাকি। মাত্র তিন মিনিট পরেই ড্যানিশদের এক প্রতি-আক্রমণ থেকে প্যাট্রিক দরগু গোল করে ম্যাচে আবার সমতা ফেরান। স্কটিশ ডিফেন্ডার টিয়ের্নি বল ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে সেই সুযোগ কাজে লাগায় ডেনমার্ক।
ইনজুরি টাইমের মহাকাব্য যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্রয়ের দিকেই এগোচ্ছে, তখনই শুরু হয় আসল মহাকাব্য। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে ইনজুরি টাইমের তৃতীয় মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে প্রায় ২২ গজ দূর থেকে বুলেট গতির শটে বল জালে জড়ান কিয়েরান টিয়ের্নি। তার গোলে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্কটল্যান্ড, আর বিশ্বকাপ নিশ্চিত করার স্বপ্নটা চলে আসে হাতের মুঠোয়।
গোল শোধ করতে মরিয়া ডেনমার্ক শেষ মুহূর্তে তাদের গোলরক্ষক স্মাইকেলকেও পাঠিয়ে দেয় স্কটল্যান্ডের বক্সে। আর সেই সুযোগেই রচিত হয় ম্যাচের শেষ এবং সবচেয়ে দর্শনীয় মুহূর্ত। ড্যানিশ আক্রমণ প্রতিহত করে বল পেয়ে যান কেনি ম্যাকলিন। তিনি দেখেন ডেনমার্কের গোলপোস্ট অরক্ষিত। প্রায় মাঝমাঠ থেকে ম্যাকলিনের নেওয়া নিখুঁত শট স্মাইকেলের মাথার ওপর দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়। ইনজুরি টাইমের নবম মিনিটে করা এই গোলে স্কটল্যান্ডের ঐতিহাসিক জয় এবং বিশ্বকাপের টিকিট পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যায়। শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই হ্যাম্পডেন পার্ক জুড়ে শুরু হয় বাঁধভাঙা উল্লাস।
অন্যদিকে, এই অবিশ্বাস্য পরাজয়ে প্লে-অফের অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল ডেনমার্ক। আগামী মার্চে প্লে-অফ জিতেই তাদের বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করতে হবে।
প্লে-অফে ওয়েলস এদিকে, আরেক ম্যাচে নর্থ মেসিডোনিয়াকে ৭-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের প্লে-অফ নিশ্চিত করেছে ওয়েলস। গ্রুপ 'জে'-তে বেলজিয়ামের পেছনে থেকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে তারা। ওয়েলসের হয়ে হ্যাটট্রিক করেন হ্যারি উইলসন।