বারো হাজার বছরের সুদীর্ঘ নিস্তব্ধতা ভেঙে আচমকাই জেগে উঠল ইথিওপিয়ার কুখ্যাত হাইলি গুব্বি (Hayli Gubbi) আগ্নেয়গিরি। প্রকৃতির এই রুদ্ররোষে কেবল পূর্ব আফ্রিকা নয়, উদ্বেগের কালো ছায়া নেমে এসেছে সুদূর দক্ষিণ এশিয়ার আকাশেও। টুলুজ ভলকানিক অ্যাশ অ্যাডভাইজরি সেন্টার (VAAC)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, অগ্ন্যুৎপাতের তীব্রতায় নির্গত ছাই ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ভাসতে থাকা এই বিশাল 'Volcanic Ash Cloud' বা ছাই-মেঘ ইয়েমেন ও ওমান পেরিয়ে এখন ভারত ও পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের আকাশকে আচ্ছাদিত করতে শুরু করেছে।
রিফ্ট ভ্যালি ও টেকটোনিক প্লেটের অস্থিরতা
স্থানীয় সময় রবিবার (২৩ নভেম্বর), ইথিওপিয়ার আফার (Afar) অঞ্চলে এই প্রলয়ঙ্করী অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়। রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং ইরিত্রিয়া সীমান্তের সন্নিকটে অবস্থিত হাইলি গুব্বি আগ্নেয়গিরিটি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'রিফ্ট ভ্যালি' (Rift Valley) অঞ্চলে অবস্থিত। ভূতাত্ত্বিকরা জানাচ্ছেন, এই অঞ্চলটি মূলত দুটি প্রধান Tectonic Plate-এর মিলনস্থল। মাটির গভীরে প্লেটগুলোর অনবরত সংঘর্ষ এবং তীব্র ভূতাত্ত্বিক গতিশীলতার কারণেই প্রায় ৫০০ মিটার উচ্চতার এই আগ্নেয়গিরিটি দীর্ঘ যুগ পর ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন স্যাটেলাইট ইমেজ এবং ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, জ্বালামুখ থেকে নির্গত ঘন সাদা ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী আকাশ ফুঁড়ে উপরে উঠছে এবং বায়ুপ্রবাহের সঙ্গে মিশে ধীরে ধীরে লোহিত সাগরের (Red Sea) দিকে ধাবিত হচ্ছে।
হোলোসিন যুগে প্রথম অগ্ন্যুৎপাত: বিজ্ঞানীদের বিস্ময়
এই ঘটনাটি ভূতাত্ত্বিক এবং আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞদের কাছে একটি বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বখ্যাত স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের 'গ্লোবাল ভলকানিজম প্রোগ্রাম'-এর তথ্যমতে, বর্তমান ভূতাত্ত্বিক যুগ বা 'Holocene Era'-তে (গত ১২ হাজার বছর) হাইলি গুব্বি থেকে অগ্ন্যুৎপাতের কোনো রেকর্ড ইতিপূর্বে পাওয়া যায়নি।
মিশিগান টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ সায়মন কার্ন ব্লুস্কাই-এ এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, "গত ১২ হাজার বছরের ইতিহাসে হাইলি গুব্বির অগ্ন্যুৎপাতের কোনো নজির নেই। এটি একটি অভূতপূর্ব ভূতাত্ত্বিক ঘটনা।" দীর্ঘ সুপ্তাবস্থা কাটিয়ে হঠাৎ এই বিস্ফোরণ বিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভলক্যানিক অ্যাশের প্রভাব
আফ্রিকা মহাদেশে উৎপত্তি হলেও, বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরের বাতাসের গতিবেগের কারণে অগ্ন্যুৎপাতের ছাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। টুলুজ ভলকানিক অ্যাশ অ্যাডভাইজরি সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, ছাইয়ের মেঘ ভাসতে ভাসতে ইতিমধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ—ভারত এবং পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে।
যদিও এখনও পর্যন্ত জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবুও ভারত ও পাকিস্তানের স্থানীয় আবহাওয়া দপ্তর এবং পরিবেশ বিজ্ঞানীরা পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছেন। বাতাসে ভাসমান এই সূক্ষ্ম ধূলিকণা ও ছাই বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো ছাড়াও স্থানীয় আবহাওয়ার ধরনে সাময়িক পরিবর্তন আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চ উচ্চতায় বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে 'Volcanic Ash' ইঞ্জিনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে, তাই এভিয়েশন সেক্টরকেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।