ফুটবল বিধাতা যেন দোহার সবুজ গালিচায় এক মহাকাব্যিক চিত্রনাট্য সাজিয়ে রেখেছিলেন। একদিকে লাতিন আমেরিকার ছন্দময় ফুটবলের ধারক ব্রাজিল, অন্যদিকে ইউরোপীয় কৌশলী ফুটবলের প্রতিচ্ছবি পর্তুগাল। নব্বই মিনিটের স্নায়ুক্ষয়ী লড়াই, গোলশূন্য ড্র এবং সবশেষে টাইব্রেকারের চরম নাটকীয়তা—ফুটবলপ্রেমীরা দেখল এক রুদ্ধশ্বাস সেমিফাইনাল। শেষ পর্যন্ত ‘সাডেন ডেথ’-এর কঠিন পরীক্ষায় ৬-৫ গোলে জয় ছিনিয়ে নিয়ে ইতিহাস গড়ল পর্তুগিজ যুবারা। অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ফাইনালে ওঠার গৌরব অর্জন করল তারা, আর চোখের জলে বিদায় নিতে হলো ফেভারিট সেলেসাওদের।
নির্ধারিত সময়ে গোলশূন্য স্নায়ুযুদ্ধ
সোমবার (২৪ নভেম্বর) রাতে কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল ছিল আক্রমণাত্মক। তবে পুরো ম্যাচে ফিনিশিংয়ের (Finishing) অভাব এবং দুই দলের গোলরক্ষকদের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। ব্রাজিলের তরুণ তুর্কিরা তাদের স্বভাবসুলভ গতিময় ফুটবলে বারবার পর্তুগালের রক্ষণভাগে হানা দিলেও পর্তুগিজ ডিফেন্ডারদের দৃঢ়তায় জালের দেখা পায়নি।
অন্যদিকে, পর্তুগাল মাঝমাঠে বল পজেশন (Possession) ধরে রেখে সুসংগঠিত আক্রমণ শানালেও ব্রাজিলের বক্সে (Box) গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধেও ছবিটা বদলায়নি। দুই দলের আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণে ম্যাচ জমে উঠলেও স্কোরবোর্ডে কোনো পরিবর্তন আসেনি। অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত সময় বা এক্সট্রা টাইম (Extra Time) না থাকায়, ৯০ মিনিটের খেলা গোলশূন্য (০-০) শেষ হতেই রেফারি সরাসরি পেনাল্টি শ্যুটআউটের (Penalty Shootout) নির্দেশ দেন।
টাইব্রেকার ও 'সাডেন ডেথ'-এর রোমাঞ্চ
ম্যাচের মূল নাটক মঞ্চস্থ হয় টাইব্রেকারে। দুই দলের ফুটবলাররাই চরম মানসিক চাপের মধ্যেও প্রথম পাঁচটি করে শটে শতভাগ সাফল্য দেখান। কেউ কাউকে এক চুলও ছাড় দিতে রাজি ছিল না। এরপরই খেলা গড়ায় শ্বাসরুদ্ধকর ‘সাডেন ডেথ’ (Sudden Death) পর্বে।
এই অগ্নিপরীক্ষায় পর্তুগালের হয়ে শট নিতে আসেন হোসে নেতো। ইস্পাতকঠিন স্নায়ুর পরিচয় দিয়ে তিনি বল জালে জড়ালে চাপ বাড়ে ব্রাজিল শিবিরে। ব্রাজিলের হয়ে সমতা ফেরাতে শট নিতে আসেন তরুণ প্রতিভাবান আঞ্জেলো। কিন্তু বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের চাপ সামলাতে ব্যর্থ হন তিনি। তাঁর নেওয়া শটটি বারের ওপর দিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পর্তুগাল শিবির। ৬-৫ ব্যবধানের এই জয়ে নিশ্চিত হয় তাদের ফাইনালের টিকিট।
শিরোপার অন্তিম লড়াই ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণী
ব্রাজিলকে হারিয়ে এখন শিরোপার স্বপ্ন দেখছে পর্তুগাল। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ইউরোপের আরেক শক্তিশালী দল অস্ট্রিয়া। এর আগে প্রথম সেমিফাইনালে ইতালিকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করেছে অস্ট্রিয়া। আগামী বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্যে মুখোমুখি হবে এই দুই দল।
অন্যদিকে, সেমিফাইনালে হেরে যাওয়া দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও ইতালি একই দিনে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে একে অপরের মুখোমুখি হবে। দোহার রাতটি ব্রাজিলের জন্য বিষাদের হলেও, পর্তুগালের ফুটবলে তা লেখা থাকবে ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায় হিসেবে।