ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে নিজেদের নামে সরকারি জমি বরাদ্দের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা বহুল আলোচিত তিনটি মামলার রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে আজ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ মোট ৪৭ জন আসামির ভাগ্য নির্ধারণী এই রায়কে ঘিরে বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) সকাল থেকেই ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
নিরাপত্তার চাদরে আদালত প্রাঙ্গণ
সরেজমিনে দেখা যায়, ‘High Voltage’ এই রায়কে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই আদালত এলাকার পরিবেশ থমথমে। প্রধান ফটকগুলোতে বসানো হয়েছে কড়া পাহারা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এজলাস কক্ষ এবং এর আশেপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ কমিশনার শহীদুল ইসলাম বলেন, “আজকের রায়ের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়মিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি ‘Public Order Management’ (পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট)-এর দুই প্লাটুন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বিজিবির (Border Guard Bangladesh) আরও দুই প্লাটুন সদস্য। পুরো এলাকাটি কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে।”
মামলার প্রেক্ষাপট ও অভিযোগের সারসংক্ষেপ
এই তিনটি মামলা দেশের রাজনৈতিক ও আইনি ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মামলার মূল অভিযোগ—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম, জালিয়াতি ও ‘State Property Embezzlement’ (রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আত্মসাৎ)-এর মাধ্যমে পূর্বাচল প্রকল্পে মূল্যবান প্লট নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বরাদ্দ নেওয়া।
মামলার নথিপত্র ও ‘Charge Sheet’ (অভিযোগপত্র) বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনটি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ছাড়াও সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এবং শীর্ষস্থানীয় আমলাসহ মোট ৪৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
তিন মামলার বিস্তারিত খতিয়ান
১. প্রথম মামলা: গত ১৪ জানুয়ারি দায়ের করা এই মামলায় প্রথমে ৮ জনকে আসামি করা হলেও, তদন্ত শেষে পুলিশ ১২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে। শেখ হাসিনা ছাড়াও এই মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন সাবেক সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন, সাবেক সচিব শহিদ উল্লাহ খন্দকার, মেজর (অব.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ।
২. দ্বিতীয় মামলা: এই মামলায় শেখ হাসিনা ও তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়সহ মোট ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে নাম থাকা অন্যান্যের মধ্যে রয়েছেন সাইফুল ইসলাম সরকার, আনিছুর রহমান মিঞা, মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন এবং শীর্ষ আমলা ও কর্মকর্তারা।
৩. তৃতীয় মামলা: এই মামলায় মূল অভিযুক্ত শেখ হাসিনা ও তাঁর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। মোট ১৮ জনের বিরুদ্ধে জাল রেকর্ডপত্র তৈরি ও অবৈধ প্লট বরাদ্দের অভিযোগ আনা হয়েছে। আসামিদের তালিকায় রয়েছেন কবির আল আসাদ, তন্ময় দাস, হাফিজুর রহমানসহ আরও অনেকে।
আইনি প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পাবলিক প্রসিকিউটর মঈনুল হাসান জানান, আইনি প্রক্রিয়ার সমস্ত ধাপ সম্পন্ন করেই আজ রায় ঘোষণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “গত ৩১ জুলাই বিজ্ঞ আদালত তিনটি মামলারই ‘Charge Framing’ বা অভিযোগ গঠন সম্পন্ন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন। দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ ও উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেছেন।”
দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের চোখ আজ আদালতের দিকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাবেক সরকার প্রধান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় এই রায় দেশের বিচার ব্যবস্থা এবং ‘Rule of Law’ (আইনের শাসন) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকতে পারে।