প্রকৃতির রোষানলে বিপর্যস্ত ইন্দোনেশিয়া। একদিকে সুমাত্রায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানির মিছিল, অন্যদিকে তার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল দেশটির পশ্চিমাঞ্চল। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) ভোরে পশ্চিম ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপ অঞ্চলে ৬.৬ মাত্রার এই শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) ভূমিকম্পের মাত্রা ও উৎপত্তিস্থল নিশ্চিত করেছে। দুর্যোগের ওপর এই নতুন দুর্যোগে স্থানীয় জনমনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে শক্তিশালী কম্পন
ইউএসজিএস-এর তথ্যানুযায়ী, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা ৫৬ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সিমেলু (Simeulue) দ্বীপের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত সিনাবাং শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার (২৭.৯ মাইল) পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিমে। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল ২৫.৪ কিলোমিটার (১৫.৭ মাইল)। ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ এই কম্পনে অনেকেই ঘুমের মধ্যে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
তবে ভূমিকম্পের মাত্রা নিয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক সংস্থা (BMKG)। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স' (সাবেক টুইটার)-এ দেয়া এক বার্তায় সংস্থাটি জানায়, রিখটার স্কেলে (Richter Scale) এই ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল ৬.৩। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনেও এই তথ্যের উল্লেখ করা হয়েছে।
সুনামি সতর্কতা ও ক্ষয়ক্ষতি পরিস্থিতি
শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের পর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সুনামি সতর্কতা (Tsunami Alert) জারি করা হয়নি, যা উপকূলীয় মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত বড় কোনো অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি বা নতুন করে হতাহতের (Casualty) খবর পাওয়া যায়নি। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের কর্মীরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং 'ডাটা' সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রকৃতির দ্বিমুখী আঘাত: বন্যা ও ভূমিধস
ইন্দোনেশিয়ার জন্য এই সময়টা অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। ভূমিকম্পের ঠিক আগেই দেশটি ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের কবলে পড়ে। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম 'কোম্পাস টিভি'-র প্রতিবেদনে জানানো হয়, সুমাত্রা দ্বীপে প্রবল বৃষ্টিপাতের জেরে সৃষ্ট ভূমিধস ও বন্যায় এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। উদ্ধারকারী দল বা Search and Rescue টিম দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ভূমিকম্পের আঘাত উদ্ধার তৎপরতায় নতুন চ্যালেঞ্জ যোগ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ধারাবাহিক কম্পন ও ‘রিং অব ফায়ার’-এর ভৌগোলিক অবস্থান
গত কয়েকদিন ধরেই ইন্দোনেশিয়ায় ঘন ঘন ভূ-কম্পন অনুভূত হচ্ছে। বৃহস্পতিবারের বড় কম্পনটির আগে, বুধবার (২৬ নভেম্বর) দিবাগত রাত ১২টার দিকে নর্থ সুলাওয়েসি অঞ্চলে ৪.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর আগে গত রোববার (২৩ নভেম্বর) দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় উত্তর মালুকু প্রদেশের হালমাহেরা অঞ্চলে ৫.২ মাত্রার আরও একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ (Ring of Fire)-এর ওপর অবস্থিত। এটি এমন একটি অস্থিতিশীল অঞ্চল যেখানে একাধিক টেকটোনিক প্লেট (Tectonic Plate) মিলিত হয়েছে। এই প্লেটগুলোর সংঘর্ষের ফলে এই অঞ্চলে নিয়মিত ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ঘটনা ঘটে থাকে।