ভূমিকা: মেধা ও রাজনৈতিক পরিচয়ের দ্বন্দ্ব
দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠিন প্রতিযোগিতা এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন (Commission)-এর চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করার পরও দেশের ১৩ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর বিচারক হওয়ার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। ১৭তম বিজেএস (BJS) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও রহস্যজনক কারণে আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত নিয়োগ গেজেট (Gazette) থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এই ১৩ জনের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ৪ জনসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম, জগন্নাথ ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন। কোনো সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ না করে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্তদের বাদ দেওয়ায় প্রার্থী পরিবার ও শিক্ষাঙ্গনে চরম ক্ষোভ ও হতাশার ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে। বাদ পড়া শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন, তাদের ব্যক্তিগত নয়, বরং আত্মীয়স্বজনের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত গোয়েন্দা রিপোর্ট (Intelligence Report)-এর ফলেই এই চরম বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে।
'নজিরবিহীন' গেজেট: নিয়োগ পেলেন ৮৮, বাদ পড়লেন ১৩
২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ১০০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা এবং পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ১০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন মোট ১০২ জনকে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করে। প্রায় ১০ মাস ধরে অপেক্ষার প্রহর গোনার পর গত ২৭ নভেম্বর আইন মন্ত্রণালয় যে নিয়োগ গেজেট প্রকাশ করে, তাতে মাত্র ৮৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাকি ১৩ জনকে নিয়োগ না দেওয়ার কারণ সম্পর্কে গেজেটে বা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কমিশনের সুপারিশের পরও নিয়োগ থেকে বাদ পড়ার এমন ঘটনা নজিরবিহীন বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদ ও আইনী বিশেষজ্ঞরা।
কারা এই ১৩ জন? বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে কোন পরিচয়?
চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও গেজেটভুক্ত না হওয়া ১৩ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন—
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি): তানসেনা হোসেন মনীষা (২৫তম মেধাক্রমে সুপারিশপ্রাপ্ত), অনিক আহমেদ, মাহমুদুল ইসলাম মুন্না ও গগন পাল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি): নিশাত মনি, নাহিম হাসান, মো. রেজাউল ইসলাম ও সাজ্জাদুল হক।
অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদিকুর রহমান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইমন সৈয়দ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মামুন হোসেন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুব্রত পোদ্দার এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হুমায়রা মেহনাজ।
এই ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা সর্বসম্মতভাবে দাবি করেছেন, তাদের কারও বিরুদ্ধেই কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক বা দেওয়ানি/ ফৌজদারি মামলা (Criminal Case) নেই। সম্পূর্ণ মেধা (Merit), যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই তারা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই বিচারক হওয়ার সুপারিশ লাভ করেছিলেন। তারা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে এই বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ সংবিধান, ন্যায়সংগত প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও সুশাসনের (Good Governance) ধারণার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
ভুক্তভোগীদের আকুতি: 'আমার পরিশ্রমের মূল্য নেই?'
বাদ পড়া শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছেন। হতাশা প্রকাশ করে রাবির শিক্ষার্থী তানসেনা হোসেন মনীষা বলেন, "২৫তম মেধাক্রমে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও আমাকে বাদ দেওয়া হলো। মেডিকেল পরীক্ষা ও ভেরিফিকেশন (Verification) সহ যাবতীয় প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করেও যখন কারণ জানতে পারি না, তখন মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আমার নামে কোনো মামলা নেই, কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও নেই।"
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইমন সৈয়দ তার বৃদ্ধা অসুস্থ মায়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, "আমার নামে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই, কোনো রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করিনি। রিকমেন্ডেড হওয়ার দীর্ঘ সময় ধরে গেজেটের অপেক্ষায় ছিল আমার পুরো পরিবার। গেজেট থেকে বাদ দেওয়ার কারণে আমার পরিবার হেনস্তার শিকার হবেন। আমি রি-ভেরিফিকেশন (Re-verification) চাই না, আমি বাকিদের সঙ্গে ১ তারিখ জয়েন (Join) করতে চাই।"
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদিকুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, "জুডিসিয়ারিতে টিকতে কত পরিশ্রম করতে হয়, তা কাকে বোঝাব! আমাদের পরিশ্রমের কোনো মূল্য নেই?"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাহিম হাসান এবং রাবির মাহমুদুল হোসেন মুন্না দুজনেই বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে দ্রুত সবাইকে একসাথে চাকরিতে যোগদানের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। মুন্না বলেন, "বৈষম্য দূর হবে এমন আশা নিয়ে নতুন বাংলাদেশে এসেও তারা এক বিশাল বৈষম্যের শিকার হলেন। আমাদের একটাই দাবি, আগামী কর্মদিবস, রোববার আমাদের সবার গেজেটের ব্যবস্থা করা হোক।"
শিক্ষাবিদদের তীব্র প্রতিক্রিয়া: 'অসাংবিধানিক ও অযৌক্তিক'
এই ঘটনায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন ও উপ-উপাচার্যরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সরদার কাইসার আহমেদ তার শিক্ষার্থীকে 'সংগ্রাম, অধ্যবসায়, সততা ও নৈতিকতার প্রতীক' হিসেবে উল্লেখ করে তার প্রতি হওয়া অবিচার মেনে নেওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবু নাসের মোহাম্মদ ওয়াহিদ এই পদক্ষেপকে 'গণআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী' বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, "বলা হয়েছিল মেধাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে, এসব প্র্যাকটিস (Practice) বন্ধ হবে। তবে এটি সেই আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী।"
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান এই সিদ্ধান্তকে 'চরম অযৌক্তিক' এবং 'অসাংবিধানিক' বলে অভিহিত করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার চাকরি হবে না— এটা তো অসাংবিধানিক। পৃথিবীর কোথাও বাবার পরিচয়ে ছেলের চাকরি হয় না। বাবার জন্য ছেলে চাকরি পাবে না, এটা মোটেও ভালো কিছু না। আমি মনে করি কর্তৃপক্ষের এটা পুনর্মূল্যায়ন (Re-evaluation) করা উচিত।"