মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিবেশী আফগানিস্তান থেকে উড়ে আসা ড্রোনের আঘাতে তাজিকিস্তানে প্রাণ হারালেন তিন চীনা নাগরিক। সীমান্ত পেরিয়ে চালানো এই হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও দুই চীনা কর্মী। শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) দুশানবেতে অবস্থিত চীনা দূতাবাস এক বিবৃতিতে এই ‘ফেটাল ইনসিডেন্ট’ বা প্রাণঘাতী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। এই ঘটনা ওই অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।
খনি কোম্পানিই ছিল ‘সফট টার্গেট’
আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার (২৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় তাজিকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাতলন প্রদেশে। এলাকাটি আফগান সীমান্তের অত্যন্ত কাছে অবস্থিত। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, হামলাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) তাজিকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, আফগানিস্তানের ভূখণ্ড থেকে উড়ে আসা একটি ড্রোন সরাসরি চীনা ‘মাইনিং কোম্পানি’ বা খনি প্রতিষ্ঠান ‘এলএলসি শাহিন এসএমকে’ (LLC Shahin SMK)-এর স্থাপনায় আঘাত হানে। ভয়াবহ বিষয় হলো, ড্রোনটির সঙ্গে শক্তিশালী গ্রেনেড যুক্ত করা ছিল, যা বিস্ফোরণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। নিহত এবং আহতরা সকলেই ওই কোম্পানির কর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
বেইজিং ও দুশানবের কড়া বার্তা
এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে চীন। ঘটনার পরপরই তাজিকিস্তানে অবস্থিত চীনা দূতাবাস স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং দ্রুততার সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের অনুরোধ জানায়। যদিও এই ‘ড্রোন স্ট্রাইক’-এর নেপথ্যে কারা—তা নিয়ে চীনা দূতাবাস সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি, তবে ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় তারা সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে।
অন্যদিকে, তাজিকিস্তান সরকার সরাসরি আফগানিস্তানের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছে। দুশানবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারকে এই ঘটনার দায় নিতে এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাবুলের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা ‘অফিসিয়াল স্টেটমেন্ট’ পাওয়া যায়নি। সীমান্তে এমন নিরাপত্তা লঙ্ঘন দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও চীনা নাগরিকদের ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় কর্মরত চীনা নাগরিকরা ক্রমশ জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর ‘প্রাইম টার্গেট’ বা প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। গত কয়েক বছরে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় চীনা প্রকল্প ও কর্মীদের ওপর একাধিক ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইসলামাবাদ এসব হামলার জন্য বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি’ (BLA) এবং ‘তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান’ (TTP)-কে দায়ী করে আসছে।
তাজিকিস্তানের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, কেবল পাকিস্তান নয়, আফগান সীমান্তবর্তী অন্য দেশগুলোতেও চীনা স্বার্থ এখন ঝুঁকির মুখে। আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশে এমন ‘ক্রস-বর্ডার টেররিজম’ বা আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।