দীর্ঘদিন ধরে চলা বঞ্চনা ও দাবি আদায়ে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার অভিযোগ এনে ফের আন্দোলনে নেমেছেন নাটোর চিনিকলের শ্রমিকরা। চাকরি স্থায়ীকরণ (Permanent Job Status) এবং যৌক্তিক মজুরি কাঠামো নির্ধারণসহ চার দফা দাবিতে শনিবার (২৯ নভেম্বর) সকালে চিনিকল গেট প্রাঙ্গণে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চলা এই বিক্ষোভে শ্রমিকদের স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা, যা চিনিকল কর্তৃপক্ষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
ন্যায্য দাবির পক্ষে অনড় শ্রমিকরা
বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়নি। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও আয় বাড়েনি, ফলে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে সাধারণ শ্রমিকদের। বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে শ্রমিক নেতারা চারটি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেন, যা অবিলম্বে বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হলো:
১. অস্থায়ী শ্রমিকদের স্থায়ীকরণ (Regularization): দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত অস্থায়ী বা টেম্পোরারি শ্রমিকদের অবিলম্বে স্থায়ী নিয়োগ দিতে হবে। ২. মহার্ঘ ভাতা (Dearness Allowance): বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় শ্রমিকদের ১৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা প্রদান করতে হবে। ৩. মজুরি পুনর্নিধারণ: অস্থায়ী শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি (Daily Wage) সম্মানজনক পর্যায়ে উন্নীত করে ৭৫০ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। ৪. কর্মঘণ্টায় সমতা: শুক্রবার ও শনিবার সাধারণ শ্রমিক-কর্মচারীদের মতো কর্মকর্তাদেরও (Officers) বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালন বা ডিউটি নিশ্চিত করতে হবে।
চার দিনের কঠোর কর্মসূচির রূপরেখা
বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে নাটোর চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ বাংলাদেশ চিনিশিল্প কর্পোরেশন শ্রমিক-কর্মচারী ফেডারেশনের নির্দেশনায় গৃহীত চার দিনের ধারাবাহিক কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ও কর্মস্থল ছাড়বেন না। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী:
৩০ নভেম্বর (রোববার): সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত এক ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন।
১ ডিসেম্বর (সোমবার): সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বিক্ষোভ এবং ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি।
২ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার): সকাল ১০টায় চিনিকলের প্রশাসনিক ভবনের (Administration Building) সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি।
৩ ডিসেম্বর (বুধবার): সকাল ৮টা থেকে দিনব্যাপী পূর্ণদিবস কর্মবিরতি (Full-day Strike)।
উৎপাদন ব্যাহতের আশঙ্কা ও আল্টিমেটাম
শ্রমিক নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ঘোষিত এই চার দিনের কর্মসূচির মধ্যেও যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা ম্যানেজমেন্ট তাদের দাবি মেনে না নেয়, তবে পরবর্তীতে আরও কঠোর ও লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। শ্রমিকদের এই আন্দোলনের ফলে চিনিকলের স্বাভাবিক উৎপাদন প্রক্রিয়া (Production Process) এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ বলেন, "আমরা আলোচনার পথ খোলা রেখেছি, কিন্তু আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। শ্রমিকদের পেটে লাথি মেরে কোনো শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।"