আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফরিদপুরের রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ফরিদপুর-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী দুই হেভিওয়েট নেতার সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আশঙ্কায় আলফাডাঙ্গা উপজেলায় ১৪৪ ধারা (Section 144) জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। শনিবার (২৯ নভেম্বর) সকাল থেকেই উপজেলাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ‘ল অ্যান্ড অর্ডার’ (Law and Order) বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।
শনিবার সকালে আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রাসেল ইকবাল ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারার এই আদেশ জারি করেন। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
নেপথ্যে বিএনপির দুই গ্রুপের ‘পলিটিক্যাল শোডাউন’
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (২৯ নভেম্বর) আলফাডাঙ্গা উপজেলা ও পৌর বিএনপির ব্যানারে আলফাডাঙ্গা পৌর সদরের আসাদুজ্জামান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে একটি সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছিল। মূলত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত এই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল ফরিদপুর-১ আসনে বিএনপির অন্যতম মনোনয়ন প্রত্যাশী (Nomination Aspirant) এবং কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সহ-সভাপতি খন্দকার নাসিরুল ইসলামের।
ঠিক একই সময়ে, অর্থাৎ শনিবার বিকেল ৩টায় আলফাডাঙ্গা পৌর সদরের আরিফুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে—যা প্রথম স্থানটির খুব কাছেই অবস্থিত—পাল্টা কর্মসূচির ডাক দেয় বিএনপির আরেকটি পক্ষ। উপজেলা ও পৌর বিএনপির বর্তমান কমিটি বাতিলের দাবিতে এই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকার কথা ছিল একই আসনে বিএনপির আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী ও বোয়ালমারী উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ভিপি শামসুদ্দিন মিয়া ঝুনুর। একই সময়ে এবং কাছাকাছি স্থানে দুই বিবদমান গ্রুপের এই ‘শোডাউন’ বা শক্তি প্রদর্শনের মহড়া বড় ধরনের সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ও নিরাপত্তা জোরদার
রাজনৈতিক এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এবং জনশৃঙ্খলার অবনতির শঙ্কা দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে উপজেলা প্রশাসন ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাসেল ইকবাল জানান, দুই পক্ষের কর্মসূচির কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। তাই জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা জারির মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এলাকাটিতে বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
অতীতের সহিংসতা ও ভয়ের কারণ
প্রশাসনের এই সতর্কতার পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক সহিংসতার তিক্ত অভিজ্ঞতা। এর আগে, গত ৭ নভেম্বর ‘বিপ্লবী ও সংহতি দিবস’ পালন উপলক্ষে পাশের উপজেলা বোয়ালমারীতেও খন্দকার নাসিরুল ইসলাম গ্রুপ এবং শামসুদ্দিন মিয়া ঝুনু গ্রুপ আলাদা আলাদা সমাবেশ ডেকেছিল। সেই দিন দুই পক্ষের উত্তেজনা চরমে পৌঁছায় এবং এক পর্যায়ে তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে (Clash) রূপ নেয়।
ওই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী আহত হন। সহিংসতার মাত্রা এতটাই তীব্র ছিল যে, একটি দলীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং অন্তত ১০টি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আলফাডাঙ্গায় না ঘটে, সে লক্ষ্যেই এবার আগেভাগেই ‘প্রিভেন্টিভ মেজার’ বা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। স্থানীয় সাধারণ মানুষ প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাজ করছে চাপা উত্তেজনা।